সে বড় অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়, সে আলোর কাছাকাছি পৌছে দেওয়ার সময়ও বটে।বিদ্যাসাগর মশাই কিংবা রাজা রামমোহন রায় ভারতের পূর্বপ্রান্তে আধো-আধো রূপে শিক্ষার আলো জ্বালাতে সচেষ্ট হয়েছেন বটে তবে পশ্চিমপ্রান্ত তখনো পুরোপুরি ব্রিটিশ সম্রাজ্যের দয়ার উপর নির্ভরশীল।তখনই ১৮৪০ সালে পুণে শহরে জ্যোতিরাও ফুলের এর সাথে সাবিত্রীর বিবাহ হয়।তাদের যুগ্ম দাম্পত্যের শুরুর সাথে সাথে সূচনা হয় এক মহৎ নারীবাদি মানবিক ইতিহাসের।
তবে বিয়ের পর থেকে যদিও ওদের মহৎ কর্মযজ্ঞের শুরু হয়েছিলো কিন্ত এর নিব আগে থেকেই তৈরী ছিলো। সাবিত্রী বিয়ের পূর্ব থেকেই শিক্ষার প্রতি এক বিশেষ আর্কষন অনুভব করতেন।এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিয়ের আগের একটি ঘটনায়। এক ইংরেজ পাদ্রী কুনো একসময় সাবিত্রী বাই কে একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। তিনি তখনো পড়াশুনা শিখেননি। কিন্ত শ্বশুরবাড়ি আসার সময় তিনি বইটি ঠিকই সাথে করে নিয়ে আসেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে পড়াশুনার প্রতি সাবিত্রী বাইর মমতা। জ্যোতিরাও ফুলের স্ত্রীশিক্ষার প্রচার এবং প্রসারের প্রতি এতো নিষ্ঠার পিছনেও অন্য এক নারীর একটি বিশেষভূমিকা রয়েছে। তিনি হলেন জ্যোতিবার মামাতো বোন সগুনা বাই। এক ব্রিটিশ কর্মচারীর বাড়িতে কাজ করার সুবাদে তিনি ইংরাজি পড়তে পারতেন। ১৮৪৭ সালে মারোওয়াড়াতে সাবিত্রীবাইয়ের স্থাপিত প্রথম স্কুলটিতে তিনিও একজন শিক্ষিকা ছিলেন। ব্রাম্মণ্যবাদিদের প্রবল বিরোধিতার মুখে সেই স্কুলটি বেশি দিন চালানো যায় নি। এমনকি তিনি যখন স্কুলে যেতেন তখন তার উপর কাদা আর গোবর ছুঁড়ে মারা হতো।কিন্তু সাবিত্রীবাই দমে যাওয়ার পাত্র নন।তাই তিনি স্কুলে যাওয়ার সময় দুখানা শাড়ি নিয়ে যেতেন। যাতে শাড়ি বদলে পাঠদান পক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারেন।কিন্তু বাধ সাধলেন জ্যোতিবা ফুলের পিতা শ্রী গোবিন্দরাও ফুলে। খুব ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি এবং পুত্রকে এসব বন্ধ না করলে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়ে দেন। জ্যোতিীরাও বিনাবাক্যব্যেয়ে বেরিয়ে যান। এরপর ১৮৮৪ সালে উনাদের দ্বিতীয় এবং ভারতের ইতিহাসে মহিলা প্রধান শিক্ষিকা সহ প্রথম মেয়েস্কুল বিরওড়াতে স্থাপিত হয়। তাও আবার মূলতঃ দলিত এবং মুসলমান মেয়েদের জন্য।শুধু কি শিক্ষা আধুনিকমনষ্ক যুক্তিবাদী শিক্ষা। এরজন্য তিনি আহমেদনগরে মিসেস ফারার এবং পুণেতে মিসেস মিচেল এর কাছে রীতিমতো ট্রেনিং নিয়ে আসেন। মেয়েদের শিক্ষার গ্রহনের জন্য উতসাহিত করার জন্য তিনি স্টাইফেন্ড ব্যবস্থাও চালু করেছিলেন। গবেষক ওলফ এবং আন্ড্রেই সাবিত্রীবাইকে নিয়ে লেখা গবেষণা পেপারে তাকে “ শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল, সমালোচনামূলক মেধাউদ্রেক কারী সমাজীক সংশোধনবাদী সর্বাঙ্গীন শিক্ষার বিকাশের জন্য কাজ করা প্রথম ভারতীয়” বলে উপস্থাপন করেন।এমনকি অনেকেই উনাকে ভারতের প্রথম মহিলা কবি হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার লেখা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিলো। শুধু কি এই? গরিব ব্রাহ্মণ বিধবারা যারা পুরুষের লালসার শিকার হয়েছেন তাদের যাতে গলায় দড়ি দিয়ে কিংবা সমাজের রোষে পিটুনি খেয়ে মরতে না হয় তাই তৈরী করেন বাল-হত্যা প্রতিবন্ধক গৃহ। তখন সমাজে বাল্য-বিধবাদের চুল কাটার রেওয়াজ ছিলো। ফুলে দম্পতীর উদ্যোগে পুণে শহরের নাপিতরা হরতাল করলেন, বিধবাদের মুন্ডন করবেন না আর। তাদের দত্তকপুত্র যশোবন্তের বিয়ে সম্ভবত আধুনিক ভারতের প্রথম অসবর্ণ বিয়ে। এমনকি বিয়ের আগে নাকি তিনি পুত্রবধু লক্ষিবাইকে কয়েকদিন বাড়িতে এনে রেখেছিলেন যাতে ছেলে এবং হবু ছেলেবউ একে অন্যকে ভালোভাবে বুঝে নিতে পারে। ভাবা যায়।
যে দেশে একলব্যের আঙুল গুরু দক্ষিণা হিসেবে জোর করে কেটে নেওয়া হয়, আর সেই গুরুর নামে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পুরষ্কার দেওয়া হয়। যে দেশে শাম্বুকের মতো বিদ্বানকে হত্যা করা হয়, যে দেশে ধর্মগ্রন্থে পশু, শুদ্র আর নারীকে এক বলে ঘোষণা করা হয় সে দেশে এক নারী যিনি নিজে দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত তিনি ধর্মিয় গোঁড়ামি, গ্লানি, অন্ধবিশ্বাস, নিপীড়িণকে তুড়ি মেরে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশষে সবার জন্য শিক্ষার ক্রান্তির জ্যোতি জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন উদাহরণ সমগ্র বিশ্বেই বিরল।
অথচ আজ তার মৃত্যুর ১০০ বছর পর সমাজ কতোটুকু আর এগোলো। আজোও আমাদের দেশে ভালেন্টাইন ডে তে ভাঙচুর হয়। আজোও অসবর্ন বিবাহের জন্য ছেলেমেয়েদের মেরে ফেলা হয়। তিসরা জানুয়ারি সাবিত্রী বাইয়ের জন্মদিন। সেদিন অন্ত্ররজালী অনুসন্ধান সংস্থা গুগল তাঁকে নিয়ে একটি ডুডল করে। অথচ আমাদের দেশে তখন আলোচনা চলছে পদ্মাবতীতে দিপিকা পাড়ুকোনের কোমরটা ব্লার করে দেওয়ায় রাজপুতদের নাক বাঁচল নাকি প্রগতিশীলদের মাথা কাটা গেলো।
অবশ্য কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে উনা, আম্বেদকর-পেরিয়ার সোসাইটির তথা বাপসার মতো বিকল্প রাজনৈতিক সমষ্টির উত্তান। রাজধানি দীল্লির বুকেই জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। এবারের নির্বাচনে বৃহৎ বাম ঐক্য এবং এবিভিপির বিরুদ্ধে দলিত আদর্শে উদ্ভুদ্ধ বিরসা-আম্বেদকার-ফুলে এসোসিয়েশন (সংক্ষেপে বাপসা) প্রার্থীরা প্রায় প্রতিটি পদেই দিত্বীয় সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে বেরিয়ে আসেন। তাছাড়া উনা লোকসভা নির্বাচনে জিগিনেশ মেবানির জয়ও এক নতুন ধারার রাজনৈতিক উত্তানের দিকনির্দেশ করছে, যা সামনের দিনে এ দেশের চেনা রাজনৈতিক সমীকরন বদলে দিতে পারে। এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো এই বদলের রাজনীতিতে এক বড় ভূমিকা ধর্মীয় অল্পসংখ্যকদেরও রয়েছে। উনা এবং জেএনিউ এর প্রতক্ষ্য প্রমান পাওয়া যায়। অল্পসংখ্যকদের প্রতক্ষয সমর্থন ছাড়া বাপসার কিঙ্গবা জিগনেশ এর জয় সম্ভব ছিলোনা।
তবে ব্রাম্মণবাদ, পিতৃতন্ত্র তথা ধনতন্ত্রীক অর্থনীতি সর্বদাই একই সুত্রে বাঁধা। তাই এর বিরুদ্ধে আন্দোলনগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে বিচার করলে চলবেনা। ব্রাম্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে দলিত-মহাদলিত -অল্পসংখ্যকদের আন্দোলন এবং পিতৃতান্ত্রীক লিঙ্গপ্রাধান্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন বলা যায় একই মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত করার দুটি আলাদা পথ। ক্রান্তজ্যোতি সাবিত্রী বাই এর জীবন এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি একই সাথে স্কুল খুলে দলিত মেয়েদের শিক্ষার জন্য লড়েছেন তেমনি ব্রাম্মণ বিধবাদের জীবনের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য বাল-হত্যা প্রতিবন্ধক গৃহ বানিয়েছেন। তবে এসবের মাঝখানে আমাদের আমাদের বাবাসাহেব আম্বেদকারের একটি কথা মাথায় রেখে চলতে হবে। তিনি বলেছিলেন, “কেবল অসবর্ন বিবাহ কিংবা সর্ববর্ণের এহসাথে বসে আহার করার মাধ্যমে বর্ণপ্রাধণ্য বিলোপ হয়ে যাবে না। কারণ বর্ণপ্রাধণ্য একটি মানসিক অবস্থা”। প্রতিবছর এপ্রিল মাস জুড়ে আমাদের দেশে “দলিত ইতিহাস উদযাপন মাস” পালিত হয়। দেশে দলিত জনসংখ্যার আনুমানিক পরিমান প্রায় ৩০০মিলিয়ন অথচ মূলধারার শৈক্ষিক সিলেবাসে দলিত ইতিহাসের অন্তর্ভুক্তি প্রায় নেই বললেই চলে। এসব কাঠামোগত বৈষম্যের দিকে আমাদের বেশি করে নজর দিতে হবে।তাহলেই ধীরে ধীরে আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ, সাম্যবাদী বিজ্ঞানমনষ্ক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
লিখেছেন :