About Us | Contact Us |

প্রেম, প্রশ্ন, নীরবতা — আর বাকিটা ব্যক্তিগত

লিখেছেন : নিচিতা ঝা
প্রেম, প্রশ্ন, নীরবতা — আর বাকিটা ব্যক্তিগত

আমরা যে ঘটনাগুলোকে প্রতিদিন স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, সেগুলো কি সত্যিই ঘটছে, নাকি আমাদের মনের ভেতরেই তাদের জন্ম? এই প্রশ্নটির কোনো সরাসরি উত্তর নেই, আর সম্ভবত সেই কারণেই প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য পরিচালিত ২০১৩ সালের বাংলা ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ এতটা অস্বস্তিকর এবং একই সঙ্গে গভীরভাবে আকর্ষণীয়। ছবিটি শুরু থেকেই দর্শককে একটি অনিশ্চিত বাস্তবতার ভেতরে নিয়ে যায়, যেখানে দৃশ্য, সংলাপ ও সম্পর্ক—সবকিছুই যেন একাধিক অর্থ বহন করে। এখানে কোনো ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে সত্য বা মিথ্যা বলে চিহ্নিত করা যায় না, আর এই দ্ব্যর্থকতাই ছবির আসল ভাষা।

ছবির কেন্দ্রে ঋত্বিক চক্রবর্তীর চরিত্রটি। বাইরে থেকে সে একেবারেই সাধারণ—শহরে থাকে, কাজ করে, মানুষের সঙ্গে মেশে। তার সম্পর্ক তৈরি হয়, কিন্তু কোথাও যেন টানটা আলগা। সে যেন নিজেই ঠিক জানে না, সে কী চাইছে। এই দ্বিধা, এই অস্থিরতাই পুরো ছবির আবহ তৈরি করে।

 

অপর দিকে অপরাজিতা ঘোষ দাসের তিনটি ভিন্ন চরিত্র ছবির গল্পকে সবচেয়ে বেশি জটিল ও অর্থবহ করে তোলে। এই তিনটি চরিত্র আলাদা আলাদা মানুষ হয়েও কোথাও যেন একই সুতোর টানে বাঁধা। একভাবে দেখলে, এগুলো নায়কের মনের তিনটি ভিন্ন অবস্থা, একটিতে রয়েছে আকর্ষণ ও আশা, আরেকটিতে দূরত্ব ও অনিশ্চয়তা, তৃতীয়টিতে সম্পূর্ণ অচেনা। ফলে মনে হয়, হয়তো এই চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষ নয় বরং নায়কের মানসিক বিভাজনের ফল।

 

আবার প্রতীকী দৃষ্টিতে ভাবলে, অপরাজিতার তিনটি চরিত্র আধুনিক সম্পর্কের তিনটি আলাদা মুখ তুলে ধরে।একই মানুষকে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে আমরা যেমন আলাদা চোখে দেখি, এই তিনটি চরিত্রও তেমনই অনুভূতির রূপ।

আর যদি তৃতীয় ব্যাখ্যাটা ধরি, অর্থাৎ ছবির ঘটনাগুলো যদি সাজানো হয়, তাহলে অপরাজিতা ঘোষের তিনটি চরিত্র হয়ে ওঠে নায়ককে বিভ্রান্ত করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। একই মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় সামনে এনে তার বাস্তববোধকে নড়বড়ে করে দেওয়াই তখন মূল উদ্দেশ্য। এই তিনটি চরিত্রই তাই ছবির অস্পষ্টতা ও গভীরতার কেন্দ্রে অবস্থান করে।

সুপ্রিয় দত্তের চরিত্রটি ছবিতে এক ধরনের অদ্ভুত উপস্থিতি। তিনি যেন শুধু একটি চরিত্র নন, বরং প্রশ্নের প্রতীক। তাঁর কথাবার্তা, আচরণ, সবকিছুতেই একটা ইঙ্গিত থাকে, যেন তিনি জানেন এমন কিছু, যা নায়ক জানে না। তাঁর উপস্থিতি ছবির বাস্তবতাকে আরও সন্দেহের মুখে ফেলে।

একসময় মনে হতে শুরু করে—এই সবকিছু কি সত্যিই ঘটছে? নাকি আমরা আসলে নায়কের মাথার ভেতরের জগৎ দেখছি? ঋত্বিকের চরিত্রটির আচরণে এমন কিছু লক্ষণ আছে, যেগুলো এই সন্দেহকে জোরালো করে। তার বাস্তবতা আর কল্পনার মধ্যে তার নিজস্ব কোনো স্পষ্ট সীমারেখা আছে বলে মনে হয় না।

 

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ছবির পুরো ঘটনাপ্রবাহ নায়কের মনের ভেতরে চলা একটা ব্যক্তিগত গল্প হতে পারে। তার জীবনে আসা মানুষগুলো, অপরাজিতার চরিত্র কিংবা অন্যরা, সবাই হয়তো বাস্তব মানুষ নয়, বরং তার প্রেম, আকাঙ্ক্ষা আর একাকিত্বের প্রতিফলন। সে যা অনুভব করে, সেটাই বাস্তব হয়ে ওঠে। বাস্তব আর কল্পনার এই মিশ্রণ তাকে বিভ্রান্ত করে, আর সেই বিভ্রান্তির ভেতরেই সে বেঁচে থাকে। আর সেখানেই ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ হয়ে ওঠে একজন মানসিকভাবে অস্থির মানুষের ভেতরের লড়াইয়ের গল্প।

 

কিন্তু ছবিটাকে শুধু এইভাবে দেখলে কিছু একটা মিস হয়ে যায়। কারণ ছবিটা কেবল একজন মানুষের মানসিক সমস্যার কথা বলে না। এটিকে পরিচালক খুব সচেতনভাবে প্রতীকী হিসাবে ব্যবহার করেছেন। অনেক দৃশ্য বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু আবেগের দিক থেকে খুব সত্য। সব মিলিয়ে একটা অনুভূতি তৈরি হয়, যেটা খুব পরিচিত। 

এই দৃষ্টিতে দেখলে নায়ক একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি না হয়ে আমাদের অনেকের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। আমরা অনেকেই সম্পর্কের ভেতর থেকেও একা থাকি। কথা হয়, কিন্তু বোঝাপড়া হয় না। কাছে আসি, আবার দূরে সরে যাই। অপরাজিতা ঘোষের চরিত্রটি এখানে কোনো নির্দিষ্ট নারীর চেয়ে বেশি, সে এক ধরনের সম্ভাবনার প্রতীক, যেটা পূর্ণতা পায় না। এই প্রতীকী ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষের অস্তিত্বগত সংকটের ছবি।

 

এই ছবিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না। দর্শক নিজেই ঠিক করে নেয়, সে কী দেখছে। এই জায়গায় এসে ছবিটা আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, কারণ এখানে আরেকটা সম্ভাবনা ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দেয়, সবকিছু কি আদৌ স্বতঃস্ফূর্ত? নাকি ঘটনাগুলো সাজানো?

 

এই ব্যাখ্যায় ছবিটা একেবারে অন্য রূপ নেয়। নায়ক তখন আর শুধু একা মানুষ থাকে না, বরং এক ধরনের পরীক্ষার বিষয় হয়ে ওঠে। তার চারপাশের মানুষরা বাস্তব, কিন্তু তাদের আচরণ পরিকল্পিত। তারা যেন নায়কের প্রতিক্রিয়া দেখছে, তাকে এক ধরনের মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। 

এখানেই ছবিটা সমাজের দিকেও আঙুল তোলে। একজন সংবেদনশীল মানুষকে আমরা কতটা সহজে ব্যবহার করি, তার আবেগ নিয়ে খেলি, এই প্রশ্নটাই এখানে সামনে আসে। এই ভাবনাটা অস্বস্তিকর, কিন্তু ছবিটা ঠিক এই অস্বস্তিটাই তৈরি করতে চায়।

 

এই তিনটি সম্ভাবনা, সবকিছু নায়কের মাথার ভেতরে চলছে, পুরো ছবিটাই প্রতীকী, কিংবা ঘটনাগুলো সাজানো, কোনোটাকেই ছবিটা বাতিল করে না। বরং তিনটাকেই খোলা রেখে দেয়। আর এখানেই ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-এর আসল শক্তি। এটি কোনো একক সত্যের ছবি নয়। এটি একাধিক সত্যের সম্ভাবনার ছবি।

 বাস্তব না কল্পনা? এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ নিজের জায়গা তৈরি করে নেয়, আর আমাদের মনে রেখে যায় একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্ন, আমরা যা দেখছি, তা কি সত্যিই ঘটছে, নাকি আমরা নিজেরাই তার গল্প বানিয়ে নিচ্ছি?

নিচিতা ঝা
নিচিতা ঝা

পর্যালোচক ও বিশ্লেষক

গল্প হলেও সত্যি

04 July, 2025 | : মীর রাকেশ রৌশান

স্মৃতির শহর মুর্শিদাবাদ

04 July, 2025 | : ফারুক আব্দুল্লাহ