ঘরটা ছোট। খাটটা ছোট। কিন্তু মানুষটা বড়।
কত বড়?
যত দূর বাতাসে পাক খেতে খেতে ভেসে যায় ইমন কিংবা বৃন্দাবনী সারং, তত বড়। কিংবা তার চেয়েও বড়। দিগন্তের মতো। নদীর মতো।
মানুষটা যে উস্তাদ বিসমিল্লা খান। তিনি উস্তাদ নাকি পণ্ডিত, তা নিয়ে খ্যাপা সানাইয়ের কোনও মাথাব্যথা নেই। যখন সানাইয়ে ফুঁ দেন বিসমিল্লা, আহ্লাদী হয় বারাণসীর গঙ্গা। বিশ্বনাথের মন্দিরের পাথরও বুঝি নড়ে ওঠে। সেই যে মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, 'বেনারস ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন।' বিসমিল্লা সেই প্রাচীনের চেয়েও প্রাচীন। কিংবদন্তিও তাঁর কাছে নবীন।
বিসমিল্লাকে কতটা মনে রেখেছে বারাণসী? পাঁচজন টোটোচালক ও রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করলাম, 'ভাই, বিসমিল্লা খানের বাড়ি চেনেন?' বাড়ি চেনা তো দূরের কথা, নামই শোনেননি। একজন বললেন, 'ওই যে সানাই...। উনি তো?' মাত্র কুড়ি বছর আগে পৃথিবী ছেড়েছেন বিসমিল্লা। এর মধ্যে ওঁকে ভুলে গেল? বারাণসী বদলে গেছে। আমার দেশও অনেক বদলে গেছে। Rapido বাইকের চালক ফৈয়াজ আহমেদ অবশেষে আমাকে নিয়ে গেলেন বিসমিল্লার দুয়ারে। বাজারের মধ্যে গলি। গলির গলিতে তিনতলা ভাঙাচোরা বাড়ি। কলিং বেলও নেই। খোলা দরজায় উঁকি দিতেই ফুটফুটে এক বালক এল। বলল, 'কোথা থেকে আসছেন?' বললাম, 'কলকাতা।' ছেলেটি আর কিছুই জিজ্ঞেস করল না। বলল, 'ও আসুন।' সরু সিঁড়ি। নানা জায়গায় আকাশ দেখা যায়। এদিকওদিক ফুটিফাটা। উপরে উঠে সে একটি খুদে কামরার দরজা খুলে দিল। বলল, 'বসুন।' সে পাখা চালিয়ে দিল। মুহূর্তে দমকা হাওয়া। এই তবে বিসমিল্লার ঘর! একসঙ্গে অনেক রাগ বুঝি বেজে উঠল। প্রেমিকাকে প্রথম চুমু খেয়েও এতটা শিহরিত হইনি, যতটা হলাম এই ঘরে ঢুকে। ওই তো বিসমিল্লার ছোট্ট খাট। তাতে পিঠোপিঠি ভাইবোনের মতো শুয়ে আছে সানাই, বাঁশি এবং ভারতের জাতীয় পতাকা। লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসে একদা কাফি রাগ বাজিয়েছিলেন উস্তাদজি। জাতীয় পতাকার গায়ে মিশে আছে বিসমিল্লার শ্বাসপ্রশ্বাস। চেয়ারে বসলাম। বাক্যহারা। এই ছোট্ট খাটটায় 'ভারতরত্ন' শুতেন কী করে? শেষবার হাসপাতালে যাওয়ার আগে এই বিছানাতেই ছিলেন তিনি। তোশকে, চাদরে দরবারির ফিসফিসানি। ঘরে ঢুকলেন এক বৃদ্ধা। নাম জারিনা বেগম। বিসমিল্লার কন্যা। আমার উল্টোদিকে বসলেন। কিছুক্ষণ কথা নেই। বললাম, 'এই খাটটা...মানে এইটুকু খাট...।' জারিনা বললেন, 'এই খাটে শুয়েই আমার কাছে জল চাইতেন পিতাজি। বলতেন, খাবার দে। সাড়ে বারোটা বাজে। খুব সহজ-সরল জীবন কাটাতেন আমার বাবা।'

কতটা সহজ-সরল?
দেওয়ালের দিকে চোখ গেল। ছবিতে ঠাসা। কোথাও সানাই বাজাচ্ছেন। কোথাও পুরস্কার নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির সই করা 'ভারতরত্ন' পুরস্কারের মানপত্রটা এতটাই আটপৌরে ভাবে দেওয়ালে ঝুলছে, যেন পাড়ার 'বালক সঙ্ঘের' মানপত্র। মেঝেতে ছড়িয়েছিটিয়ে আরও কত পুরস্কার, যার একটি পেলেই যে কোনও লোকের জীবন ধন্য হবে। জারিনা বললেন, 'বাবা বলতেন, অহঙ্কার করবি না। আল্লাহ রেগে যাবেন। দুটো রুটি, একটু ডাল, একটু সবজি পেলেই খুশি।' পাশে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লার বংশধর শাদাব বলেন, 'কাবাব খেতেও খুব ভালোবাসতেন।' আমি আর বেশিক্ষণ চেয়ারে বসতে পারলাম না। নীচে একটা লাল কার্পেট পাতা। সেখানেই বসলাম ধপাস করে। আমার মাথা নিচু, ক্রমশ নিচু হয়ে আসছিল। আমার পিঠ ঠেকে আছে উস্তাদজির খাটে। শিরদাঁড়া দিয়ে স্রোত বইতে লাগল। ইমন অথবা মল্লারের স্রোত। ভালোবাসার স্রোত। বিসমিল্লার মেয়ে আমার পিঠে হাত রাখলেন। মনে হল বিসমিল্লারই হাত। জুঁই ফুলের মতো স্নিগ্ধ। বুঝতে পারছি, জল ধেয়ে আসছে চোখে। বেয়াড়া জল। সামলানো মুশকিল ভারি।
বললাম, 'বাড়িতে আর কে কে আছেন?' জারিনা বলেন, 'একসময় ৮০-৮৫ জন লোক ছিল। আট কিলো আটা মাখতাম রোজ। এখন পঁয়ত্রিশ জন আছে। আলাদা রান্না করে। আলাদা খায়।' আপনারা তো ভিভিআইপি কেন্দ্রের লোক। সরকার কোনও খোঁজখবর নেয় না? একটু থামলেন জারিনা। বললেন, 'বাবার মৃত্যুর দিন বাড়ির উপর হেলিকপ্টার পাক মেরেছিল। এখন কেউ খোঁজ নেয় না।' মন্দিরের দেবতা নিশ্চয় খোঁজ নেয়। বালাজি মন্দিরের এক কামরায় ঘরেই যে রেওয়াজ করতেন উস্তাদজি। জারিনার কথায়, 'সানাইয়ে 'রঘুপতি রাঘব' বাজাতে খুব ভালোবাসতেন পিতাজি।' হিন্দু-মুসলমানের শ্বাস তাঁর গায়ে লেপ্টে ছিল। একবার উস্তাদজিকে আমেরিকায় থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি যাননি। কেন জাননি, সেটা জানে দেশবাসী। তবু একবার মনে করিয়ে দিলেন জারিনা। বললেন, 'বাবা যাননি। বলেছিলেন, আমেরিকায় মা গঙ্গা আছেন? বাবা বিশ্বনাথ আছেন? আমি যাব না। আগে আমেরিকায় একটা বেনারস বানাতে বলো, তারপর ভেবে দেখব।' খাটের উপর সানাইয়ের পাশেই রাখা বেশ কয়েকটি বাঁশি। বিসমিল্লার বুকের বাতাস ওই বাঁশিতে ধরা আছে। জারিনা বলেন, 'একদিন চাঁদনি রাতে বাবা ছাদে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। হাওয়া দিচ্ছিল খুব। বাঁশির সুরে আমরা পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। গঙ্গার ধারে গেলে আজও পাগলা হাওয়ায় সেই বাঁশির সুর শুনতে পাবেন।' জারিনার চোখে বিন্দু বিন্দু জল। সুরে সুরে বাঁশি পুরে তুমি আরো আরো আরো দাও তান...।
দশাশ্বমেধ ঘাটে সেদিন গঙ্গারতি হচ্ছিল। নদীর বুকে অজস্র নৌকোয় বসে সেই আরতি দেখছিল কত মানুষ। মুহুর্মুহু ঘণ্টাধ্বনি, চিৎকারের মধ্যে পাক খাচ্ছিল বিসমিল্লার নাছোড় সানাই। একা। ভিড়ের মধ্যে নির্জনে।
ছোট খাট, ছোট ঘর। গঙ্গার পাড় দিয়ে, চুরাশিটা ঘাট ছুঁয়ে বিসমিল্লার সানাই তবু ছুটে যায় অনন্তের দিকে। সে ধরা দেয় না। বাতাসে ভাসতে থাকে শুধু। আজ, কাল, পরশু...।
লিখেছেন :