ভারতের গণতন্ত্রের সুরক্ষাবর্ম হলো তার সংবিধান, আর সেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। সুপ্রিম কোর্ট বারবার সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ একটি অপরিবর্তনীয় সাংবিধানিক মূল্যবোধ। কিন্তু সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মৌলিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্য অবস্থান দেখা যাচ্ছে, তা ভারতীয় গণতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্যই এক গভীর হুমকি। ২০২৬ সালের ৩রা মার্চ দোলযাত্রার দিন কলকাতার ভবানীপুরে এক জনসভায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। আমি হিন্দুদের বিধায়ক; হিন্দুরা আমাকে বিধায়ক করেছে।” তিনি আরও সতর্ক করেন “ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতা” ও “নাস্তিকতা”-র বিপদ সম্পর্কে এবং “বৃহত্তর হিন্দু ঐক্যের” ডাক দেন। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বন্ধুজন ও দীর্ঘ গণআন্দোলনের কর্মী সৌম্য মন্ডল কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা (পিআইএল) দায়ের করে শুভেন্দু অধিকারীর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থীপদ বাতিলের দাবি জানান।
আইনের দৃষ্টিতে স্ববিরোধিতা ও নজিরবিহীন বালাসাহেব ঠাকরে মামলা
আইনের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পষ্ট: যে ব্যক্তি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়, সে কি সেই একই সংবিধানের অধীনে আইনপ্রণেতা হতে পারে? উত্তরটি স্পষ্টতই “না”। ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রত্যেক প্রার্থীকে সংবিধানের প্রতি সত্যনিষ্ঠা ও আনুগত্যের শপথ নিতে হয়। কিন্তু এখানেই এক গুরুতর বৈপরীত্য প্রকট হয়। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আদর্শগতভাবে বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা করে এসেছে। সম্প্রতি আরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে প্রকাশ্যেই সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। অথচ রাজনৈতিক টিকে থাকার বাস্তবতায় বিজেপি তার দলীয় সংবিধানে “ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির প্রতি সত্যনিষ্ঠা ও আনুগত্য” প্রদর্শনের কথা বলতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে তারা সংবিধানের শপথ নিচ্ছেন বটে, কিন্তু তাঁদের আদর্শগত অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। জনস্বার্থ মামলাটিতে এই বিষয়টিকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে যে, একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী প্রকাশ্যে সংবিধানের মূল কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করলে তার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রসঙ্গে ১৯৯৫ সালের বালাসাহেব ঠাকরের ঘটনাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী নজির হয়ে আছে। সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’-র বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেওয়ার অভিযোগে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন তদানীন্তন শিবসেনা প্রধানের ভোটাধিকার কেড়ে নেয় এবং ছয় বছরের জন্য তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেও বিরত রাখে। আদালতের এই কঠোর পদক্ষেপ ছিল একটি সুস্পষ্ট বার্তা যে, জাতির ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধে আঘাতকারী যত শক্তিশালী নেতাই হোন না কেন, তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হবে না।

“ভোট নষ্ট হবে, এটা নিশ্চিত”: আইনি বাস্তবতা ও বিকল্প প্রার্থীর সন্ধান
এই নজিরের আলোকেই বলতে হবে, শুভেন্দু অধিকারী আর কে? সবাই জানে, শুভেন্দু পুরোপুরি বালাসাহেব ঠাকরে হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি প্রথম অর্ধ (হিন্দুত্ববাদী অবস্থান) গ্রহণ করলেও দ্বিতীয় অর্ধ (ঠাকরের মতো অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব) হয়ে উঠতে পারেননি। সেই বালাসাহেব ঠাকরেরই যখন সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারে আঘাত করার জন্য ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তখন শুভেন্দু অধিকারীর প্রার্থীপদ টিকে থাকার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
তাই ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের সাধারণ ভোটারদের কাছে একটি কড়া বাস্তব সত্য তুলে ধরতেই হবে: শুভেন্দু অধিকারীকে ভোট দেওয়া মানে নিজের মূল্যবান ভোটটি নষ্ট করা। হাইকোর্টে সৌম্য মন্ডলের করা মামলায় শুভেন্দুর প্রার্থী পদ খারিজ হবেই। যদি নির্বাচনের আগেই কোর্টের রায় এসে যায়, তাহলে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার যোগ্যই থাকবেন না। আর যদি আদালতের রায় দিতে কিছুটা দেরিও হয়, তবুও কয়েক মাস পর এই রায় আসবেই। এর অর্থ দাঁড়াবে, কোনোরকমে (‘বাই চান্স’) জিতে গেলেও কিছু মাসের মধ্যেই তাঁর আসন বাতিল বলে গণ্য হবে এবং পুনরায় উপনির্বাচন (বাই-ইলেকশন) করাতে হবে। আর সেই উপনির্বাচনে দোষী সাব্যস্ত শুভেন্দু আর দাঁড়াতেই পারবেন না।
যারা বর্তমান তৃণমূল সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান, তাদের কাছে সুস্পষ্ট আবেদন, তারা যেন এই ‘ভোট নষ্ট’ করার ফাঁদ এড়িয়ে যান এবং বিকল্প প্রার্থী বেছে নেন। যেমন ভবানীপুরে সিপিআই(এম) প্রার্থীকে এবং নন্দীগ্রামে সিপিআই প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন। কারণ রাজনৈতিক বাস্তবতা এই যে, শুভেন্দু অধিকারী বা তাঁর মতো নেতারা আরএসএস বা কমিউনিস্টদের মতো কোনো আদর্শগত রাজনীতি করেন না। এঁরা ক্ষমতার রাজনীতি করেন। ভোটে দাঁড়াতে না পারলে কিংবা জনপ্রতিনিধি থাকার অধিকার হারালে এই ‘রাজনীতি ব্যবসায়ী’ রাজনীতিই ছেড়ে দেবেন।
সহাবস্থানের ভিত্তি রক্ষার লড়াই
ভারতের সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন; বাঙালি, বিহারি, পাঞ্জাবি, মারাঠি, আদিবাসী সকল নাগরিকের মধ্যে সম্পাদিত এক পবিত্র সমঝোতার প্রতীক। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের যে নীতি সংবিধান প্রতিষ্ঠা করেছে, তার ভিত্তিভূমি হলো এই ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ভিত্তিতে আঘাত করা মানে আমাদের সহাবস্থানের ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করা। সৌম্য মন্ডলের জনস্বার্থ মামলাটি তাই কেবল একজন রাজনীতিকের প্রার্থীপদ বাতিলের দাবি নয়; এটি ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক চরিত্র রক্ষার লড়াই। আর এই লড়াইয়ে প্রাজ্ঞ ভোটাররাই হচ্ছেন শেষ রক্ষাকবচ, যাঁরা ‘ভোট নষ্ট’ না করে গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁদের মূল্যবান রায় দেবেন।
লিখেছেন :