About Us | Contact Us |

ভারতে আন্তঃধর্ম বিবাহ : আইন ও সমস্যা

লিখেছেন : রাজিব এল রায়
ভারতে আন্তঃধর্ম বিবাহ : আইন ও  সমস্যা

ধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবার পূর্বেই বিবাহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সম্ভবত ব্যক্তিগত সম্পত্তি উদ্ভব হওয়ার পরবর্তী স্তরে বিবাহ প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল, ধর্ম তাকে পবিত্রতার মোড়ক দেয়। বিবাহের মানদণ্ড হিসেবে ধর্ম অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন, কিন্তু ধর্ম পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। বিবাহ ধর্ম পালনের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রাচীন প্রায় সব ধর্মশাস্ত্র বিবাহ, বিবাহের পদ্ধতি এবং পরবর্তী যৌন জীবন নিয়ে বিধান দিয়েছে। প্রত্যেক ধর্মের ক্ষেত্রে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, উপজাতি গোষ্ঠীর চালচলন জীবন যাপনের বিধিগুলো তৈরী করেছে, তেমনি বিবাহের বিধি নির্মাণ করেছে, ক্রমে যা অলঙ্ঘনীয় গণ্য হয়েছে।  একথা অনস্বীকার্য মানুষের জৈবিক প্রবনতা বহুগামিতা এবং মুক্ত যৌনাচার যাকে ধর্মের চোখরাঙানি নিগড় পরাতে পারেনি যার ফলশ্রুতি বিশ্বের বিপুল মিশ্র জনজাতি, মিশ্র সংস্কৃতি। 
   বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে আন্তঃধর্ম বিবাহ সম্পর্কে বিধি নিষেধ রয়েছে। শুধু অন্য ধর্মে বিবাহ নয় এমনকি একই ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন জাতি ( caste) এর মধ্যে বিবাহ বিষয়ে নিষেধ রয়েছে। সবক্ষেত্রে ধর্ম বা শাস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এমন নয়, কোথাও গীর্জা কোথাও পুরোহিত কোথাও মৌলভীরা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন যা সমাজের মূল ধারার সঙ্গে মিশে গেছে শাস্ত্রীয় বিধান হিসাবে। 
   ইহুদী ধর্মে হালাখায় বিধর্মীদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ ও বাতিল। কিন্ত বাইবেল ওল্ড টেস্টামেন্ট বর্ণিত ব্যক্তিদের আন্তবিবাহ করতে দেখা গেছে তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে মহিলাগণ ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করবার পর বিবাহ হয়েছে। বর্তমানে ইহুদীদের মধ্যে ধ্যান ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৯৫ সালে তারা ঘোষণা করে যে আন্তঃ বিবাহ সম্পর্ক তারা সর্বতোভাবে মেনে নিচ্ছে, ধর্মান্তর কোন পূর্ব শর্ত নয়।
   খ্রিষ্টানদের মধ্যে ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টদের মধ্যে একসময় বিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছিল। যিশু খ্রিস্ট নিজে এ ধরনের নিষেধের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং সবরকমের উদারতার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু গীর্জাতে আন্তঃধর্ম বিবাহ চালু ছিল না। ভারতীয় খ্রীষ্টানদের জন্য ১৮৭২ সালের Indian Christian Marriage Act ৪ ধারা মতে কোন খ্রীষ্টান যুগল বা খ্রীষ্টান ব্যক্তি অন্য কোন ধর্মের ব্যক্তিকে এই আইনে বিবাহ করতে পারে এবং সে বিবাহ বৈধ হবে। চমৎকার ব্যাপার খ্রীষ্টান পুরুষ বা মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রে এইটে প্রযোজ্য।
   পার্সি ধর্মে পুরুষ বা নারী উভয়ে অন্য ধর্মে বিবাহ করতে পারতেন না, সেরূপ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পার্সি ধর্ম বিরোধী আখ্যা দেওয়া হতো। এবং ধর্মীয় সমাজ থেকে বহিস্কার করা হত। (রতনবাই পেটিট ও মহ আলি জিন্নাহ বিবাহ)। এমনকি পার্সি মহিলা অন্য ধর্মে বিবাহ করে পার্সি জীবন যাপন করলে ও তার পার্সি সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ছিল না।( গোলরুখ গুপ্তা বনাম বুর্জর পরদিওয়ালা, ৪/১২/২০১৭, গুজরাট হাইকোর্ট। হাল অবস্থা অনেক পরিবর্তীত হয়েছে। পার্সি পুরুষ যেকোনো ধর্মে বিবাহ করে পার্সি জীবন যাপন করতে পারেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে অবস্থাটা পূর্বের ন্যায়, যা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। 
   মুসলিম ধর্মে আন্তঃধর্ম বিবাহ অপরিচিত বিষয় নয়। যেকোনো মুসলিম পুরুষ অন্য কোন আসমানী কিতাবি ধর্মের নারীকে বিবাহ করতে পারেন এবং সেই বিবাহ বৈধ গণ্য হবে। কিন্তু অকিতাবি ধর্মের নারীর সহিত বিবাহ সম্পর্ক অনিয়মিত বা ফসিদ গণ্য হবে, বিবাহিতা নারী মুসলিম ধর্মান্তরিত হলে বিবাহ বৈধ গণ্য হবে। মুসলিম ( কুরআন) মতে ইহুদী, খ্রীষ্টান, পার্সি প্রভৃতি কিতাবি ধর্ম, অন্যদিকে হিন্দু বা তদ্রুপ ধর্মগুলি অকিতাবি। মুসলিম নারী অন্য ধর্মে বিবাহ করলে মুসলিম মতে বিবাহ অবৈধ বা বাতিল ( কুরআন , সুরা বাকারা , ২২১ )। সিয়া ও সুন্নি মতাবলম্বীদের মধ্যে বিবাহ ছিল শর্তবহুল, উভয়ের উত্তরাধিকার এবং বিবাহ নিয়মে অনেক ফারাক রয়েছে। মুসলিম ব্যাক্তিগত আইন মতে দুজন মুসলিম দম্পতির মধ্যে বিবাহ সর্বদা বৈধ। কিন্তু সামাজিক বিন্যাস অনুসারে মুসলিমদের মধ্যেও উঁচু নিচু জাত ব্যবস্থা রয়েছে, যা পাত্র পাত্রী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ।
   হিন্দুদের মধ্যে অন্য ধর্মে বিবাহ এর চেয়ে বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ বিষয়ে বেশি আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু তখন প্রাচীন কালে ধর্মের বেড়া তৈরী না হওয়ায় সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল না, বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও একেবারে অচল ছিল না। ৬ঠ শতকে হিন্দুদের উপর বৌদ্ধদের শাষন শুরু হলে হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে বিবাহ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৩শ শতকে মুসলিম আগমনের পর হিন্দু বৌদ্ধ জৈন ধর্মীয়দের মধ্যে বিবাহ অনেক স্বাভাবিক হয়ে আসে। অন্য দিকে হিন্দু পুরুষ বা নারীর সহিত মুসলিম ব্যক্তির বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে, সংশ্লিষ্ট হিন্দু ব্যক্তি ধর্মচ্যুত হতেন ও মুসলিম হিসেবে গণ্য হতেন, এমনকি যে কালে মুসলিম পীরকে কৃষ্ণের অবতার বর্ণনা করা হয়েছে ( বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা, গোপাল হালদার) । এ কথা ঠিক যে আইনগত বাধা না থাকলে ও হিন্দু বৌদ্ধ জৈন শিখ ধর্মীয়দের মধ্যে বিবাহ স্বাভাবিক কোন নিয়ম নয়, বরঞ্চ নিজেদের মধ্যে বিবাহ বেশি চল। হিন্দু বিবাহ আইন ১৯৫৫ এই চার ধর্মকে হিন্দু ধর্মের মধ্যে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং এই আইনে শুধু মাত্র দুজন হিন্দুর মধ্যে বিবাহ হতে পারে। হিন্দু ধর্মে অতিরিক্ত রক্ষণশীলতার কারণে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অন্য ধর্মে বিবাহে পুরুষ বা নারী উভয়ে: ধর্মচ্যুত গন্য করা হয়েছে, স্পষ্টত কোন নিষেধ না থাকলে ও আন্তঃ ধর্ম বিবাহ অচলতা ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী। আজ সারা পৃথিবী এক অবিচ্ছিন্ন মানব সমাজে পরিনত হয়েছে। বর্ণবাদ ( apar theism) প্রায় নির্মূল হয়েছে। যা রয়েছে চোরাগোপ্তা এবং বেআইনি। ( বেশীর ভাগ পাত্র এখনো বিবাহের সময় ফর্সা পাত্রী খোঁজেন )।  ভারতে ইসলামী যুগে ও ইংরেজ আমলে অনেক আন্তঃ ধর্ম বিবাহ ঘটেছে যা হিন্দু ধর্মের সংকোচন ঘটিয়েছে। ধর্মান্তরিত না হয়ে বিবাহের ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। 
   ভারতে বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ (Special Marriage Act, 1872) তৈরী হয়। এই আইনে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আইনসম্মত বিবাহ সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু দম্পতিকে বিবাহের সময় লিখিতভাবে ঘোষণা দিতে হত উভয় পক্ষ কোন বিশেষ ধর্মকে স্বীকার করে না। ভারত স্বাধীন হবার পর  'ভারতীয় বিশেষ বিবাহ আইন ১৯৫৪'  আনীত হয়েছে। যাকে বিচারপতি কুরেশি " একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা উত্তর সাংবিধানিক দর্শনের প্রতিফলন" বলেছেন। 
   বিবাহ হতে পারে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন এবং নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক প্রথা ( Rites and Customs ) অনুসারে, যা ধর্মের বা শাস্ত্রের নিদান অনুসারে। প্রত্যেক ধর্মে পৃথক পৃথক আচার অনুষ্ঠান ও প্রথা রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করবার কারণে অনেক আচার বা প্রথার আদান প্রদান হয়েছে, বিবাহকে জাঁকজমকপূর্ণ করতে নানা রকম আচার আচরণ পালিত হয়ে থাকে যার সঙ্গে বিবাহের কোন সম্পর্ক নেই এবং বাহুল্য। সরকারি উদ্যোগের কারণে ইদানিং বিবাহ পঞ্জিকরনের ঝোঁক বেড়েছে। ভারতজুড়ে বেশিরভাগ বিবাহ আজতক ধর্মীয় প্রথা অনুসারে হয়ে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় প্রথার বিভিন্নতা রয়েছে। দম্পতি একই ধর্মীয় হলে প্রথার ঐক্য খুঁজে নেয় যা তাদের ধর্মীয় স্বকীয়তা (identity) বজায় রাখে। 
   আন্তঃ ধর্ম বিবাহের ক্ষেত্রে (inter faith marriage) ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিবাহ অসংখ্য হয়েছে। এবং দম্পতি অনেক সময় নিজ নিজ ধর্ম পালন করে সংসার করে থাকেন। প্রশ্ন হল তারা কোন প্রথায় বিবাহ করবেন। একজন হিন্দু ও একজন খ্রিস্টান জোড় হিন্দু ধর্মের প্রথা মেনে বিবাহ করলে সেই বিবাহ বৈধ হবে না ( AIR 2009 SC 1085, GulliPilli Sowria v Bandaru Pavani) । কিন্তু এই বিবাহে প্রভা গুলি কার্যকর হবে ; তাদের বিবাহ বৈধ না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের মোকদ্দমা চলনসই হবে না, বিবাহ বাতিল মোকদ্দমা করা যাবে।
   আন্তঃ ধর্ম বিবাহের ফলে কয়েকটি বিড়ম্বনা দেখা যায়: ১) বিবাহ বিচ্ছেদ ২) উত্তরাধিকার ৩) সন্তানদের জাতি মর্যাদা (caste status ) তিন ক্ষেত্রে -
১) বিবাহ বিচ্ছেদ হবে বিশেষ বিবাহ আইনের নিয়ম মেনে যদি বিবাহ বিশেষ বিবাহ আইনের বিধানে সংঘটিত হয়ে থাকে। কোন ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিবাহ থাকলে বাতিল বিবাহ (nullity of marriage) গণ্য হবে । বিবাহ যে ভাবেই হয়ে থাকে। উভয় ধর্মের আচার ও রীতিনীতি পালন করে বিবাহ করলে ও সেই বিবাহ বৈধ হবে না (K Hemakumari v D P Yadagiri)। যদিও খ্রীষ্টান মতে (Christian Marriage Act, 1872, Sec 5) বৈধ হবে। শ্রীমতি নীতা কীর্তি দেশাই বনাম বিনো স্যামুয়েল জর্জ (AIR 1998 Bom 74) কেসে দম্পতি বিবাহ করেছিলেন হিন্দু মতে যদিও স্বামী ছিলেন খ্রীস্টান । বোম্বে হাইকোর্ট বিবাহ অবৈধ ঘোষণা করেন। কেরালা হাইকোর্ট দেববালান বনাম বিজয়াকুমারী মোকদ্দমায় ( AIR 1991 Ker 175) বিবাহ বৈধ বলে, কিন্তু ঐ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ঐ রায়কে বাতিল করে বিবাহ বাতিল ঘোষণা করেন ( 2004 DMC 667 Ker DB)। যেহেতু এ ধরনের বিবাহ বৈধ নয় সুতরাং বিবাহ বিচ্ছেদের প্রশ্ন থাকছে না। কিন্তু খোরপোষ আইনে বিবাহ মান্যতা পাবে। 
২) আন্তঃ ধর্ম বিবাহের ক্ষেত্রে সন্তানদের উত্তরাধিকার পেতে পারবে বিবাহ হোক প্রথা মেনে বা বিশেষ বিবাহ আইন মেনে। উত্তরাধিকার এর জন্য সবচেয়ে বড় ব্যাপার সন্তান পিতা বা মাতা কার সমাজে বা কোন ধর্মীয় সমাজে বাস করছে বা কোন সমাজ তাকে একীভূত করে গ্রহণ করেছে। স্বামী হিন্দু কিন্তু স্ত্রী খ্রীষ্টান, কন্যা সন্তান মায়ের সঙ্গে খ্রীষ্টান সমাজে বাস করে খ্রীষ্টান প্রথা মেনে। সন্তান খ্রীষ্টান নিয়মে উত্তরাধিকার পাবে ( 2004 DMC 667 Ker DB) ভারতীয় সমাজে সন্তানের উত্তরাধিকার সাধারণত স্বামীর উত্তরাধিকার নিয়ম অনুযায়ী চলে থাকে। আন্তঃ ধর্ম বিবাহ এর সংখ্যা বৃদ্ধিতে নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের বৃহৎ ভূমিকা রয়েছে, সঙ্গে নাগরিক জীবনে জটিলতা ও বৃদ্ধি পেয়েছে, দম্পতির ধর্ম চেতনা সন্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয় (Halsbury's Law of England)। ধরা যাক স্বামী হিন্দু ও স্ত্রী মুসলিম, সেক্ষেত্রে সমস্যাগুলি হবে : ক) সন্তানরা পিতার উত্তরাধিকার কিভাবে পাবেন বা মাতার উত্তরাধিকার কিভাবে পাবেন, খ) সন্তানের উত্তরাধিকার কিভাবে ঠিক হবে, গ) স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে এবং উভয়ে উত্তরাধিকারী দাবি করলে - সন্তান পিতার নিকট থাকলে ও হিন্দু হিসেবে পরিচিত হলে বা মায়ের কাছে থাকলে মুসলিম হিসেবে পরিচিত হলে উত্তরাধিকার কি হবে। মুসলিম স্বামী এবং হিন্দু স্ত্রীর ক্ষেত্রে একই সমস্যা দেখা দেবে। বিশেষ বিবাহ আইনে নিবন্ধিত আন্তঃ ধর্মীয় দম্পতি ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনের ২য় চ্যাপ্টার অনুযায়ী নিজেদের উত্তরাধিকার ঠিক করতে পারেন।
৩) আন্তঃ ধর্মীয় দম্পতির স্ত্রী বা স্বামী একজন তফসিল জাতি ভুক্ত হলে সন্তানের জাতি পরিচয় সাধারণত পিতার জাতি অনুসারে হয়ে থাকে। পিতা তফসিল জাতি ভুক্ত হলে সন্তান সেই সুযোগ সহজে লাভ করতে পারেন। কিন্তু পিতা অহিন্দু এবং মাতা তফসিল জাতি ভুক্ত হলে সন্তান সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। রোহিত ভেমূলা ঘটনা উল্লেখ করা যায় যাঁর পিতা ভাদেরা ও বি সি শ্রেণী ভুক্ত কিন্তু মা ছিলেন মাল তফসিল জাতি ভুক্ত, তিনি তফসিল জাতি পরিচয়পত্র পেয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুতে পুলিশ রিপোর্টে এই পরিচয়পত্রকে মিথ্যা পরিচয় উল্লেখ করে। শুধু মাত্র পিতার পরিচয়কে নির্ণায়ক ধরে নিয়ে আইনসম্মত নয় এমন রিপোর্ট। রোহিত ভেমূলা বরাবর তাঁর পিতার ত্যাজ্য হয়ে মা এর সাথে মায়ের পরিচয়ে বসবাস করেছেন। (AIR 1959 SC 1327, VV Giri v DS Dora), ( Govt. of India, G.O No. 39/37/73- SCT-1 dt. 21/05/1977), (AIR 1958 Assam 128) ।
   আন্তঃ ধর্ম বিবাহের খারাপ দিক হিসাবে প্রেম জিহাদ (love zihad) প্রচারিত। বিশেষত মুসলিম ধর্মের অন্য ধর্মে বিবাহে ধর্মান্তরিত কর্বার ম্যান্ডেট থেকে এ ধারণা এসেছে, যা আধুনিক বিশ্ব বা মুক্ত চিন্তার সঙ্গে খাপ খায় না। খ্রীষ্টান ধর্ম এর মধ্যেও ধর্মান্তরকরণের একই প্রচার ও চেষ্টা রয়েছে, তবে সেটা বিবাহের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। ভারতে ২০০৯ সালে প্রথম কেরলে বিষয়টি নজরে আসে, যদিও এ বিষয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। হাদিয়া মামলায় ( K M Asokan v S P of Police) কেরালা হাইকোর্ট সংঘটিত বিবাহ বাতিল করেন, হিন্দু মেয়েলাভ জিহাদের শিকার গণ্য করেন। যদিও সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় খারিজ করে এবং এন আই এ তদন্তের নির্দেশ দেন, তদন্তে জানানো হয় লাভ জিহাদ এর মতো তথ্য পাওয়া যায় নি। বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচুড় মোকদ্দমাটিকে পিতৃতান্ত্রিক স্বৈরাচার ( patriarchal autocracy) বর্ণনা করেছেন ( AIR Online 2018 SC 1136)। যদিও Sahan Sah A v State of Kerala ( 2010(1) KHC 121)  মোকদ্দমায় বলপূর্বক ধর্মান্তর এর উল্লেখ করা হয়েছে। জোসিনা মেরি জোসেফ বনাম সেজিন মোকদ্দমায় খ্রীষ্টান পিতা তার মেয়ে লাভ জিহাদের শিকার হয়েছেন অভিযোগ করেন, কিন্তু দেখা যায় ধর্মান্তর এর ঘটনা সেখানে ঘটেনি ( কেরালা হাইকোর্ট)। কোন সাবালককে তার পিতা মাতা আন্তঃ ধর্ম বিবাহে ( inter faith) বাধা দিতে পারে না ( 2009(16) SCC 360, 2006(15) SCC 475 )। ভারতে কয়েকটি রাজ্য লাভ জিহাদ তত্ত্বকে অতিরঞ্জিত করে ধর্মান্তর আইন তৈরি করেছে। উত্তর প্রদেশ সরকার ' বিবাহের জন্য বলপূর্বক ধর্মান্তর' বিরোধী আইন করেছে যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বলা হয়েছে ক) ভুল বুঝিয়ে, বল, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব, জবরদস্তি, প্রলোভন, বা ছলনার দ্বারা ঘটলে ৫ বছর জেল ও ১৫ হাজার টাকা জরিমানা খ) কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা তফসিল জাতি/ উপজাতি মহিলাদের ধর্মান্তরের ক্ষেত্রে ১০ বছর জেল ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা গ) যদি এটা গণ স্তরে  ঘটানো হয় ৩-১০ বছর জেল ও ৫০০০০ টাকা জরিমানা হবে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে বিবাহের একমাত্র উদ্দেশ্য যদি মেয়ের ধর্ম পরিবর্তন হয় তবে সেই বিবাহ শূন্য (void) হবে। এ ধরনের আইন তৈরীর পিছনে বাস্তবতার চেয়ে কল্পনা ও সেকেলে (outdated) চিন্তা ধারা কাজ করেছে। বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট বিবাহের জন্য ধর্ম পরিবর্তনকে বেআইনি বলেছেন। KS Putuswami v Union of India ( 2017(10) SCC 1) মোকদ্দমায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রেম ও বিবাহে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ব্যক্তি স্বাধীনতায় শীতল প্রভাব দেয়, এবং বিবাহ বা বিবাহ বহির্ভূত সঙ্গী নির্বাচন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ও আত্মপরিচয়ের অংশ ( choice of a life partner, whether by marriage or outside it, is part of an individual's personhood and identity)। লতা সিং বনাম স্টেট অব ইউ পি ( AIR 2006 SC 2522) মোকদ্দমায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন ভারতীয় জনগণ ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ব ও বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করলে সংবিধান শক্তিশালী থাকবে ( constitution will remain strong only if We accept the plurality and diversity of our culture)। এই বৈচিত্র্যের অধিকার যতখানি পুরুষ ভোগ করে নারী করতে পায়না। ফলে এ ধরনের বিবাহ পুরুষের যতটা যুতসই নারীর জন্য নয়, লিঙ্গ বৈষম্য আচ্ছন্ন করেছে। ভারতে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার দম্পতি আন্তঃ ধর্ম বিবাহ করে থাকেন যাদের বয়স ২০-৩০ বছরের মধ্যে। ভারতে এধরনের বিবাহ বেশি হিন্দু মুসলিমের মধ্যে ঘটে থাকে। যাদের মধ্যে হিন্দু মেয়ে ৫২% এবং মুসলিম মেয়ে ৪২%। লাভ জিহাদ তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন ধর্মের নারী পুরুষের প্রেমকে চরম হুমকিতে ফেলেছে। উত্তর প্রদেশে ধর্মান্তর ঘটনায় পুলিশ গ্রেফতার করেছে। লাভ জিহাদ একটি পরিকল্পিত প্রচারণা। ( Myth of love zihad - Charu Gupta.)  এ কথা ঠিক যে ভারতে আন্তঃ ধর্ম বিবাহ এর বিরুদ্ধে প্রচারণা হঠাৎ এখন শুরু হয়নি, ১৯২০ এর দশকে এবিষয়ে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। এখনো উত্তেজনা বয়ে চলেছে, শুধু ধর্মের বিভিন্নতা দুজন মানুষকে তাদের পছন্দের সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ভয়ের এক বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে যেখানে পিতা মাতা এমনকি সরকারী কর্তৃপক্ষকে এই অধিকার হরণের আইনি অধিকার দিচ্ছে। ' লাভ জিহাদ ' প্রচার যেমন একটি গোষ্ঠীর কাজ তেমনি ' ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ ' ( অর্থাৎ হিন্দু পুরুষ ভালবাসার ফাঁদে ফেলে মুসলিম নারীকে বিবাহ করে) প্রচার বিপরীত কট্টর গোষ্ঠীর কাজ। যদিও এই প্রচারণার কোন সারবত্তা নেই বা কোন তথ্যগত ভিত্তি নেই। 
   ভারতীয় সমাজে বর্ণবাদ ( উঁচু নিচু জাত) দ্রুত অপসৃয়মান, যার পথ ধরে আন্তঃ ধর্ম বিবাহ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। সকল ধর্ম দর্শন হল অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে বিবাহের ক্ষেত্রে সেই নমনীয়তা বজায় রাখে না। বিবাহ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির অধিকার ধর্ম - রহিত হলে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ দরকার হবে না। সকল মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক স্বাধীনতা আন্তঃ ধর্ম বিবাহ বিরোধ সম্পূর্ণ দূরীকরণ ঘটাবে |

ঋণ: সোস্যাল জাস্টিস

রাজিব এল রায়
রাজিব এল রায়

বিশিষ্ট আইনজীবী