প্রথম যে প্রশ্নটার উত্তরকে আমরা অত্যন্ত 'স্বাভাবিক' ভাবেই আছে বলে ধরে নিই সেই প্রশ্নটাই মনে হয় খুব গোলমেলে। সেই প্রশ্নটা হলো সন্তান কার! বাবা শুক্রানু দিলেন, মা ডিম্বানু। বাবা গর্ভধারণ করতে পারেন না। মা করেন। সে এক দীর্ঘ এবং অবশ্যই যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়াও। আনন্দ নিশ্চয়ই থাকে তাতে, যেহেতু মানুষের প্রজন্মগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে, যাতে মানুষ পৃথিবীর বুক থেকে মুছে না-যায়, বিবর্তন এই আনন্দবোধের জন্ম দিয়েছে। যেহেতু মা ও বাবার সঙ্গমে (আজকাল অন্যভাবেও হতে পারে) সন্তান জন্মায় অতএব সন্তান তাঁদের। বিশেষ করে মায়ের অধিকার বেশীই হবার কথা, যেহেতু তিনি না থাকলে সন্তান আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মায়ের গুরুত্বও বেশী হওয়া উচিত।
কিন্তু সম্পদের বিবর্তন যেমন ভাবে ঘটেছে তাতে কালে কালে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মা বা নারীর অবস্থা হয়েছে জমির মত। যে মালিক পুরুষ, সে-ই অধিকারী। অতএব সন্তানের বেড়ে ওঠার লালন-পালনের বেশীটা নারী করলেও সন্তানের বিষয় সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার পুরুষেরই থেকেছে। কালে কালে বুর্জোয়া শাসন এসেছে। ব্যক্তিমালিকানার গুরুত্ব আরো বেড়েছে। কিন্তু বুর্জোয়ারা যেহেতু একদা সাম্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েই এসেছিল, তাই কিছু সংস্কার প্রক্রিয়াকে তারা জায়গা দিয়েছে। অবশ্যই আন্দোলনের চাপে। নারীর ভোটাধিকার থেকে সন্তান মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হবে পারবে ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোও অনেক সময়ের আন্দোলনের ফসল। একদিনে পাওয়া অধিকার নয়। যাই হোক, এগুলো অনেকেই জানেন বা সবাই জানেন হয়তো, তবু মনে করালাম। কারণ আমরা এখন আরেকটা দিকে চাইবো।
অন্যান্য প্রাণীজগতে কথা আনছি না। আমি খুব বেশী জানিও না সে বিষয়। আর যা জানি, তাতে অনেক জটিল আলোচনা হবে। আপাতত মানুষকেই দেখি। মানুষ যখন সম্পত্তি পুজোয় ব্যস্ত ছিল না, সম্পদ সবার অধিকারে ছিল একত্রে, তখন সন্তানও গোষ্ঠীর সন্তান ছিল। একজন জন্ম দিচ্ছেন বলে শুধু তাঁর অধিকারের অন্তর্ভূক্ত ছিলো না এটা। গোষ্ঠীগুলো ছোটো আর বাঁচতে ও বাঁচাতে হলে সবার সবাইকে সাহায্য করা দরকার। ফলে নৃতত্ত্বের ইতিহাসে বহু গোষ্ঠী বিপুল একটা সময়কাল জুড়ে, যা তথাকথিত সভ্যতার হাজার দশেক বছরের প্রায় তিরিশ গুন বেশী হবে, সন্তান সম্পর্কে যাবতীয় সিদ্ধান্ত সঙ্ঘবদ্ধভাবে নিতো। তাদের বাড়া থেকে বাঁচার উপযোগী শিক্ষা, সক্ষমতা সবই গোষ্ঠীর দ্বারাই একরকম পরিচালিত হত।
আমরা যদি লিপিবদ্ধ ইতিহাসকালের দিকেই তাকাই তাহলেও দেখব আধুনিক সময় বলশেভিক সোভিয়েত রাশিয়া যা করার চেষ্টা করেছে, সন্তান সম্পর্কে গোষ্ঠী, সমাজ ও রাষ্ট্রগত বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে তা অনেক প্রাচীন স্পার্টাতেও ছিল। আরেকটু অন্যরকম ভাবে ও অন্য উদ্দেশ্যে। সেখানে একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর, বিশেষ করে মায়ের দুধ ছাড়ার কিছুকাল ছাড়ার পরেই, সন্তানদের একটি যৌথশিবিরে রাখা হতো। লিঙ্গ নির্বিশেষে। তারা মা-বাবা বলে আলাদা করে কাউকে জানতো না, একটা বয়সী সব্বাইকে মা-বাবা বলতো। যেমন এখনো বহু জায়গায় আমরাও বয়স্কদের মা বা বাবা বলে সম্বোধন করি প্রাচীন কৌম স্মৃতি অনুযায়ী। তথাকথিত আদিম জনজাতি থেকে কিছু বুর্জোয়া রাষ্ট্রও এদিকে এগোতে চেয়েছে এবং চাইছে। ভারত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা কি এদিকে এগোচ্ছে?
না। স্পষ্টতই, তারা যাদের দ্বারা এখন শাসিত তারা চায় পবিত্র পরিবার ব্যবস্থা। আদর্শ হলো, পুরুষ সন্তান বেশী গুরুত্বপূর্ণ, নারী সন্তান ভ্রুণেও মারা চলে। যে ক'জন নারী বাঁচবেন তাঁরা মা, বোন, বৌ, প্রেমিকা, বান্ধবী ইত্যাদি সব সম্পর্কেই মাথা নীচু করে চলবেন। পিতৃতন্ত্রের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূল্যবোধগুলোকে তাঁদের অপরিসীম শক্তি ব্যয় করে বয়ে চলবেন। এবং সবটাই তাঁদের করতে হবে গর্বের সঙ্গে। এর মানে এই নয় যে এর আগেও প্রচুর নারী-স্বাধীনতা নিয়ে রাষ্ট্র ভেবেছে। কিছু বিষয়ে কিছু কাজ হয়েছে। বেশীরভাগটাই হয়নি। তবু যে সব কাজ হয়েছে তার একটা ধাক্কা এসে লেগেছিল সমাজে ও রাষ্ট্রে। তাই পিতৃতন্ত্র অত্যন্ত বিচলিত হচ্ছিল। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রও। এখন তারা সরাসরি ক্ষমতায় এসে উপরে উপরে কিছু কাজ দেখাচ্ছে, কিন্তু সেই প্রাচীন 'লক্ষ্মণরেখা'-কে আরো গভীর করে টেনে দিচ্ছে। তারা নারীর যাবতীয় শ্রম ও বুদ্ধিমত্তাকে শুধুমাত্র তাদের উদ্দেশ্য সাধনেই কাজে লাগাবে, তার বাইরে গেলেই হিসেব কষে নেবে। ইসরোতে আপনি বিজ্ঞানী হয়ে সমর প্রস্তুতি এবং যোগাযোগ ইত্যাদির উন্নতি ঘটাতেই পারেন, কিন্তু নারী হলে শাড়িটা পরতেই হবে। ঐটা দিয়ে বোঝা যাবে আপনি এই শাসন মানছেন কিনা!
তো, এটা বাংলাতে নেই এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলার শাসকেরা একদিকে নারীর হাতে অর্থ দিচ্ছেন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কিছু নারীকে এগিয়ে দিয়েছেন ইত্যাদি যেমন সত্যি অন্যদিকে রক্ষণশীল ভাবনাগুলোকে সবটা ছাড়তে না পেরে কখনো চরিত্র নিয়ে কখনো কে কটায় বেরোবে তা নিয়েও সমন জারি করে বসছে। এর আগের শাসকদেরও নারী স্বাধীনতা নিয়ে খুব বেশী চিন্তা ছিল এমন অপবাদ দেওয়া যাবে না। এই একই চরিত্র থেকে চলাফেরা নিয়ে নানা কথা আমার আজও মনে আছে। তবে কিছুই কি হয়নি?
না, এমনটা নয়। স্বতন্ত্রভাবে নারীবাদী আন্দোলনেরা বাড়ছে। দাবী-দাওয়া-সংগঠন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে খানিক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে যারা সংখ্যায় বড় দল নয় তাঁদের মধ্যে। সেখানেও নারীমুক্তি আন্দোলন নিয়ে আরো কথাবার্তা বাড়ছে। এবং এই সময়েই ঘটেছে অভয়ার ঘটনাটি।
অন্য সব বিষয় বাদ দিলেও ঘটনাটি আমাকে অন্তত দেখিয়েছিল যে সমাজের গভীর মনস্তত্ত্বে, অচেতন স্তরে অন্তত সব সন্তান সবার, সব সন্তানের ভালবাসা থেকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়-দায়িত্ব সবার, এইটা চাপা পড়ে যাওয়া স্তর থেকে একেবারে লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। নারীরা, ট্রান্সজেন্ডারেরা তো বটেই, পুরুষেরাও ভেতর থেকে একটা ধাক্কা খেয়ে ১৪ই অগাস্ট রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। হ্যাঁ, আপাতভাবে বিরাট প্রাপ্তি কিছু ঘটেনি আমাদের। তদন্ত বা বিচারও সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল বিপুল গোষ্ঠী ঐতিহ্যের ঐ অসম্ভব সম্ভাবনাময় উপস্থিতি। আমাদের বর্তমান সময়ের রাজনীতি এখনো একে বুঝতে বা প্রায়োগিকভাবে নারীমুক্তি থেকে মানবমুক্তির স্তরে নিয়ে যেতে প্রস্তুত নয়, এও মনে হয়েছে। কিন্তু আশার আলো ও তার ঝলমলে বিচ্ছুরণ আমার মনকে বলেছে, ভয় নেই, দিন আসছে।
১৪ই অগাস্ট বুঝিয়ে দিয়েছিল, অভয়া একটি পরিবারের সন্তান নয়, সকল পরিবার, যাঁরা এখনো যূথচারীতাকে পুঁজির নির্মম আক্রমণের দিনেও ভুলে যাননি, যাঁরা এখনো চান একটি সুন্দর সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সকলের জন্য, তাঁদের সকলের সন্তান। অভয়া, তাঁর রক্ত-মাংসের দেহ অতিক্রম করে একটি মুক্তিচিহ্নে পরিণত হয়ে গেছেন সেই থেকে।
কাল থেকে যে তোলপাড় চলছে সেই প্রসঙ্গে আর দু-এক কথা লিখেই থামবো। ব্রিটেনে নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন এমালিন প্যাঙ্কহাস্ট। কথায় নয়, কাজে যুদ্ধ করেছেন। রীতিমতো মারামারি থেকে পুলিশ পেটানো, আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া, জানালা ভাঙা কত্ত কিছু করেছেন। দারিদ্রকে এবং দরিদ্র শিশুদের একসময় কাছ থেকে দেখে শিউরে উঠেছেন। চেষ্টা করেছেন অবস্থা বদলাবার। এই প্যাঙ্কহাস্ট একসময় তথাকথিত বাম ব্রিটিশ লেবার পার্টিতেও যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু...।

কিন্তু একদিন তিনি নিজের ছোট মেয়েকেও স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের সংগঠন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন বড় মেয়ের পক্ষে থেকে। সমাজবাদের বিরোধী তিনি তদ্দিনে। শুধু তাই নয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে খোলাখুলি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বড় প্রবক্তাও হয়ে উঠেছিলেন প্যাঙ্কহাস্ট। সরাসরি দক্ষিণপন্থী হয়েছিলেন। সঙ্গে ইউজেনিক্স বা উন্নত জাতির যে কুৎসিত চরিত্র যা নাজিজম, ফ্যাসিজমের বৈশিষ্ট্য, তাতেও যুক্ত হয়ে গেছিলেন, উন্নত নারী উন্নত জাতি গঠন করে বলে। অর্থাৎ জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনকে যুদ্ধে সহায়তা করাটা পুঁজিবাদের সহায়তা, আর এইটা নাজিদের আগেই নাজিবাদের প্রচার কানাডায়।
কাজেই এমন হয়। তথাকথিত শিক্ষিত নারী মুক্তিকামী, প্রবল দক্ষিণপন্থী হয়। এখানেও আমরা গত কয়েকবছরে এমন বেশ কিছুজনকে দেখেছি। কাল দেখলাম আরেকজনকে। কিন্তু তাঁকে কি দোষ দেব?
উচিত হবে না। কারণ তিনি তো মঙ্গলগ্রহ থেকে আসেননি। আমাদেরই সমাজ, শিক্ষা, চেতনা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তাঁর মতো নারীদের জন্ম দেয়। লালন-পালন করে পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী অথবা গোঁড়া অন্য কোনো ধর্মবাদী করে। এমনকি আপাত দৃষ্টিতে নাস্তিক হলেও, অন্যান্য যাবতীয় সংস্কার ও ধারণা অপরিবর্তনীয় থেকে যায়, যেহেতু এখনো সমাজ-সংস্কারের এক-দশমাংশ কাজও আমরা করে উঠতে পারিনি। রাজনৈতিক শিক্ষা এখনো বেশীরভাগের কাছেই বহুদূরের বিষয়। তাই একে আমাদের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতার দিক থেকে দেখাই ভাল।
উনি যে খুব একটা সাধারণ বুদ্ধি বা কমন সেন্স ব্যবহার করেননি তা তো বোঝাই যাচ্ছে। একটা দল যারা ধর্ষকদের মাথায় চড়ায়, যাদের নিয়ন্ত্রিত তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করেছে সেখানেই উনি প্রার্থী হতে চাইছেন। ব্যক্তিগত ক্রোধ, অভয়াকে নারী নয়, সন্তানরূপী সম্পদের চেহারায় তাঁকে দেখাচ্ছে এখন। কারণ কথায় আছে কমন সেন্স ইজ দ্য মোস্ট আনকমোনেস্ট থিং অব অল। অতএব আমরা ওঁকে দেখব অভয়ার জীববৈজ্ঞানিক ভাবে জন্ম দেওয়া অসহায় মা রূপে। কিন্তু অভয়াকে আমরা দেখব কেমন করে?
এই যে আজকের অভয়া, ইনি মৃত্যুর থেকে বাড়ছেন দিনে দিনে। তাঁকে লালন-পালন করছেন লিঙ্গ ও শ্রেণী রাজনীতির মানুষেরা। ইনি জন্মদাত্রীর সম্পদ নন, ইনি আমাদের যৌথ অচেতনায় থাকা দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের সম্মানীয় প্রতীক। নিজের তথাকথিত মায়েরও হাতের বাইরের, লড়াই-এর ডাক।
লিখেছেন :