পশ্চিমবঙ্গের সর্বসমাপ্ত SIR যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এই নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। বিতর্ক আছে SIR এর উদ্দেশ্য নিয়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এই নিয়ে ভিন্ন মতামত আছে। কেউ হয়তো ভেবেছিলেন ২ কোটি অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি ধরা পড়বে এই SIR এর মাধ্যমে ফলে তাদের এতদিন ধরে করে আসা দাবির সত্যতা প্রমাণিত হবে। কেউ হয়তো ভেবেছিলেন তাদের ভোটব্যাঙ্কের একটা বড় অংশের ভোটারদের নাম কেটে দেওয়া হবে এবং তারা এই নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ লাভ করবে; আবার কেউ হয়তো ভেবেছিলেন শুধুমাত্র ভোটার তালিকার সংশোধন হচ্ছে - এটা বড় কোন বিষয় না।
SIR ২০২৬ এর আইনি বৈধতা বা Representation of the People Act, 1950 (RP Act 1950) এর সাথে কতটা আপস করে SIR করা হয়েছে সেটা আর আলোচনার দাবি রাখে না। কারণ এই SIR নিয়ে একাধিক মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। একরকম বলা যেতে পারে সুপ্রিম কোর্টের মধ্যস্থতায়ই পশ্চিমবঙ্গে SIR হচ্ছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যে পদ্ধতিতে SIR হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে তা ভিন্ন। এখানে ড্রাফ্ট লিস্ট প্রকাশিত হবার পরে যৌক্তিক অসঙ্গতির (Logical Discrepancy) লিস্ট বেরিয়েছে। তারপর আবার লিস্ট বেরিয়েছে বিচারাধীন (Under Adjudication) ভোটারদের। অন্যান্য রাজ্যে এত কিছু হয় নি। এখন খুব সহজেই প্রশ্ন করা যায় শুধু পশ্চিমবঙ্গেই এইভাবে SIR করা হল কেন? বা অন্যান্য রাজ্যে SIR সুপ্রিম কোর্টের মধ্যস্থতায় হল না কেন? শুধু পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদেরই হয়রান করা হল কেন? SIR নিয়ে হরেকরকম প্রশ্নের শেষ নেই। কিন্তু উত্তর অধরা।
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ার সাথে সাথেই ভারতের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সাথে ১৯৪৭ সালের আগে পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক একক বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল এবং অবিভক্ত বাংলার সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। অবিভক্ত বাংলা বিভাজিত হয়েই আজ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ (পূর্ব বঙ্গ) রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত এই অঞ্চলের মানুষের ভাষা, ইতিহাস, খাদ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি কমবেশি এক। ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বঙ্গীয় অঞ্চলের মানুষদের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। কাঁটাতারের বেড়া বসে বাংলার বুকে। নতুন সীমান্ত সৃষ্টি করা হয় এবং তার প্রহরা দেওয়ার জন্য দুই দিক থেকে নিযুক্ত করা হয় সীমান্ত প্রহরীদের। ভিসা ছাড়া আসা যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুই পারের বাঙালিদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সৃষ্টি করা হয় অসীম দূরত্বের। এদিকে পূর্ববঙ্গে ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের আধিক্য ও পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আধিক্য থাকায় উন্নত সামাজিক সুরক্ষার উদ্দেশ্যে শুরু হয় মাইগ্রেশন।
লক্ষ লক্ষ হিন্দু বাঙালি পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যেমন পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেট করেন সেরকম লক্ষ লক্ষ মুসলমান বাঙালিও পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পূর্ববঙ্গে মাইগ্রেট করেন। ১৯৪৭ পরবর্তী একাধিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ফলে এই মাইগ্রেশনের সংখ্যা আরো বাড়ে। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু বাঙালিদের একটা বড় অংশ মাইগ্রেট করেন। তাছাড়া হিন্দু বাঙালিদের ফার্টিলিটি রেট মুসলমান বাঙালিদের তুলনায় কম হওয়ায় পূর্ববঙ্গের হিন্দু বাঙালিদের শতকরা হার কমতে থাকে। ফার্টিলিটি রেটের তারতম্যের ফলে পশ্চিমবঙ্গেও মুসলমান বাঙালিদের জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি পায়। এই ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে সামাজিক মাধ্যম সহ বিভিন্ন ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে রটিয়ে দেওয়া হয় যে পশ্চিমবঙ্গ 'বাংলাদেশি মুসলমান' ও 'রোহিঙ্গা' অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে। যদিও এর কোন বাস্তবিক ভিত্তি নেই। একটি নির্দিষ্ট আদর্শের রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা ভেবেছিলেন SIR এর মাধ্যমেই এই তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হবে। কিন্তু SIR এ তথাকথিত কোন অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পাওয়া যায় নি। ফলে তারা হতাশ।
আবার যারা ভেবেছিল SIR এ শুধুমাত্র ধরে ধরে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়া হবে তারাও এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না পরিস্থিতি। কারণ এখনও সেইভাবে মুসলমান বাঙালিদের নাম বাদ দেওয়া যায় নি। প্রথমে 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি' ও এখন 'আন্ডার এডজুডিকেসন' তালিকায় মুসলমান বাঙালিদের উপস্থিতি বেশি থাকায় মুসলমান বাঙালিদের নাম বাদ দেওয়া নিয়ে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের মুসলমান বাঙালিদের ভীত সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও তারা কতটা সফল হবে তা সময়ই বলবে। কারণ 'আন্ডার এডজুডিকেসন' মানে ডিলিট বা বাদ না। যদিও এই লিস্টে থাকা ভোটাররা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে আশঙ্কায় ভুগছেন। বর্তমানে যে ৬০ লক্ষাধিক মানুষকে 'আন্ডার এডজুডিকেসন' এর তালিকায় ফেলে রাখা হয়েছে তার একটা বড় অংশ হয়তো সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় স্থান পাবে। এদিকে ফাইনাল লিস্ট প্রকাশিত হলে দেখা গেল প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। কমিশনের ওয়েবসাইটে বিধানসভা ভিত্তিক ERO দের 'Statutory Report' এ দেখা যাচ্ছে এই সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের সিংহভাগ অমুসলিম বাঙালি। যদিও "SIR এর মাধ্যমে শুধু মুসলমান বাঙালিদের হয়রান করা হচ্ছে" এই বক্তব্যের কোন হেরফের হবে না বলেই প্রতীত হয়।
ফলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সমাজে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ফের তীব্র হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। ধর্মের আধারে বাঙালির বিভাজন প্রকট হচ্ছে এবং এই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে (বাইনারি পলিটিক্স) সংসদীয় রাজনীতিতে ভোটবাক্সে ফায়দা তোলার পথ সুগম হচ্ছে কিছু রাজনৈতিক দলের। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের রুজি রুটি, চাকরি বাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা বা নাগরিকত্ব সুবিধার প্রশ্নগুলো আসন্ন নির্বাচনেও হয়তো গুরুত্ব পাবে না। গুরুত্ব পাবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, ধর্মীয় বিভাজন। পশ্চিমবঙ্গে 'SIR PROJECT' এর পেছনে হয়তো এটাই ছিল একটি সুনির্দিষ্ট কারণ।

পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী হিসেবে অন্ততঃ সচেতন বাঙালিদের (ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে) ভাবা উচিৎ একটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ইস্যুগুলি কি কি হওয়া উচিৎ! ধর্মীয় বিভাজন না রাজ্যের সর্ব ধর্মের, সর্ব শ্রেণীর মানুষের উন্নয়ন? সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ না উন্নত পরিকাঠামো? কৃষক, শ্রমিক মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সশক্তিকরণ না সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও ধর্মীয় রাজনীতির আড়ালে কর্পোরেট রাজ স্হাপন?
লিখেছেন :