খাবেন কী? প্রশ্নটা হয়তো আজ অতটা তীব্র মনে হচ্ছে না। বাজারে এখনও চাল-ডাল আছে, রান্নার গ্যাসও কোনোভাবে জোগাড় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে ভবিষ্যতের ছবিটা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। অনেকেই মনে করছেন LPG সঙ্কটই বড় সমস্যা। বাস্তবে কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ লুকিয়ে আছে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের ভিতরে।
ভারতের কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে রাসায়নিক সারের ওপর। বিশেষ করে ইউরিয়া, ডিএপি (DAP) এবং পটাশ—এই তিনটি সারের ওপর দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই সারের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাই এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সঙ্কট এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চাপে পড়ে গেছে।
ভারত দেশে ব্যবহৃত ইউরিয়ার প্রায় ৮৭ শতাংশ নিজেই উৎপাদন করে। কিন্তু এই উৎপাদনের মূল ভিত্তি হল অ্যামোনিয়া, আর অ্যামোনিয়া তৈরির জন্য প্রয়োজন প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG। গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে অনেক গ্যাস-ভিত্তিক সার কারখানাকেই উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ইউরিয়ার বাজারে।
ডিএপি বা ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটের ক্ষেত্রেও ভারতের বড় অংশ নির্ভরশীল আমদানির ওপর। প্রায় ৬০ শতাংশ ডিএপি বিদেশ থেকে আসে, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো থেকে। বাকি অংশ দেশেই তৈরি হলেও তার কাঁচামালও বহুলাংশে অ্যামোনিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে সার উৎপাদন শৃঙ্খল পুরোটা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এরপর আসে পটাশের প্রশ্ন। পটাশ এমন একটি সার যা ভারত প্রায় সম্পূর্ণটাই বিদেশ থেকে আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটলে পটাশের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে এই সারের দামের ওঠানামা কৃষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সারের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়বে। ফলস্বরূপ চাল, ডাল, সবজি—সব ধরনের কৃষিজ পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। আগামী কয়েক মাসে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সবচেয়ে বড় আঘাতটা পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর।
অবশ্য এই সংকটের আরেকটি ভিন্ন দিকও রয়েছে। রাসায়নিক সারের দাম বাড়লে কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প কৃষি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে পারেন। জৈব চাষ বা কম রাসায়নিক নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হল—এই পরিবর্তন এক দিনে সম্ভব নয়। কৃষি ব্যবস্থার হঠাৎ রূপান্তর ঘটলে স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা খাদ্যবাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
তাই বিষয়টি শুধুমাত্র গ্যাস বা জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আসলে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ এবং জ্বালানি বাজারের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে।
এই কারণেই বিশ্ব রাজনীতির প্রতিটি সংঘাত শুধু সীমান্তের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। তার ঢেউ পৌঁছে যায় কৃষকের মাঠে, বাজারের দামে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের থালায়। তাই যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ততই বাড়বে।
এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সময় থাকতে বিকল্প কৃষি নীতি, সার ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে পারব, নাকি পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার অপেক্ষা করব?