About Us | Contact Us |

আনন্দভোট

লিখেছেন : ওয়াহেদ মির্জা
আনন্দভোট

আনন্দমঠ -এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের নির্বাচনকে কেন্দ্র লেখা "আনন্দভোট"

 

  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'আনন্দমঠ' (১৮৮২) উপন্যাসটি মূলত ১৭৭০-এর দশকের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ এবং বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত ৷ আনন্দভোট রচনা করতে যাচ্ছি উনিশ শতক ভারত ও ২০১৪ এর পর বিকশিত ভারত প্রেক্ষাপট নিয়ে৷ 

 

 

১৮৮২ সালে আনন্দমঠ প্রকাশিত হল ৷ চারিদিকে শঙ্খ ধ্বনি ৷ মুসলমান রাজত্ব শেষ করে ইংরেজ রাজত্ব দিতে বলেছেন৷ ইংরেজরা মুসলমানদের অরাজকতা থেকে উদ্ধার করিবেন৷ এই উপন্যাসের বিরোধ ছিল ইংরেজের সঙ্গে নয় ,মুসলমানদের সঙ্গে৷ সেই ধারায় তৈরি ১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক ৷ যা হিন্দু সমাজের কাছে একটি সামাজিক সংগঠন৷ ফলে কমিউনিস্ট ও কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে মিশে চলল দেশভক্তির তথ্য আদান প্রদান৷ চলে এল ২০১৪ এর জাতীয়তাবাদী সরকার৷ এই জাতীয়তাবাদ উনিশ শতকের হিন্দু জাতীয়তাবাদ৷

 

আনন্দমঠ উপন্যাসে যেরকম ভবানন্দ বলছিলেন - আমাদের মুসলমান রাজা রক্ষা করে কই ? ধর্ম গেল ,জাতি গেল ,মান গেল ,এখন ত প্রাণ পর্যন্তও যায়৷

 

আনন্দভোটে দেখা গেল " হিন্দু সমাজের মধ্যে ধ্বনিত হতে লাগল " মুসলমানরা বাড় গেছে এদের টাইট দিতে হবে " 

 

তখন যেরকম জমিদারের বেশিরভাগ ছিল হিন্দু এখন তেমনি আমলা - নেতা - মন্ত্রী সব হিন্দু ৷ প্রজা তখনো ছিল মুসলমান এখনো সেই মুসলমান চাষাভুষা ৷ তখন যে রকম ভাবা হয়েছিল মুসলমানদের জন্য হিন্দুদের ধর্মাচরণ হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল বলে মনে করতেন উনিশ শতকের বহু প্রধান সমাজ চিন্তক৷ তাই তারা চতুরতার সঙ্গে যে - কোণও প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেলেই হিন্দুত্বের প্রতীক ব‍্যবহারের চেষ্টা করতেন৷ তেমনি আজকের সমাজচিন্তক ও সাহিত্যিক ,লেখকদের কাছে " হিন্দু খতরে মে হ‍্যায়" রয়ান নির্মাণ হয়েছে এর ফলে তাঁরা কলেজ ,থানা ও স্কুল সব জায়গায় ধর্ম আচরণ বাড়িয়ে তুলছেন সংস্কৃতির নামে৷

 

দেশকে তখন যে মাতৃভূমির রূপ দেওয়া হয়েছিল৷ সেই মায়ের রূপ দেওয়া হয়েছে আর্য জনগোষ্ঠী উচ্চবর্ণীয়৷ আজও সেই যবন ও দলিত ,আদিবাসীদের ঘরের মাকে মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না তা SIR এ নির্মবরগের অবহেলিত নারীদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে৷সেই দশভূজা রুপী মায়ের কোনখানে যবন ,দলিত ,আদিবাসী প্রজাদের ঠাঁই হবে ৷ কেন না এই মা তো সম্পূর্ণরূপে সনাতন ধর্মের৷

 আজও ভারতবর্ষে জাতি প্রতিষ্ঠা চলছে গরীব মানুষের জীবন - সমস্যা সমাধান না করেই৷ বঙ্কিমচন্দ্রের যেই জাতীয়তাবাদ শত্রু সন্ধান করেছে সেই রকম মোদি- মোহনভাগবতের জাতিয়তাবাদ শত্রু হিসেবে মুসলমানকে দাঁড় করিয়েছে৷ আনন্দমঠের জাতীয়তাবাদ ও আনন্দভোটের জাতীয়তাবাদ শত্রুসন্ধান ছাড়া বাঁচে না ,বাড়ে না৷

 

আনন্দমঠ উপন্যাসে যখন সত‍্যানন্দ বলেন- আমরা রাজ‍্য চাহি না - কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদের সবংশে নিপাত করিতে চাই৷ সেই রকম আজকে দীলিপ ও শুভেন্দু বলছে যে রামকে মানবে না ,সে পাকিস্তানে চলে যাক ৷ না হলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে৷ উপন্যাসে যেরকম নিত‍্য সচনন্দ বিষ্ণুপূজা করবে বলে মুসলমানদের ঘরে আগুন দেয় ৷ তেমনি এখনো আগুন দেওয়া হচ্ছে মসজিদে মাজারে ও ঘরে চলছে বুলডোজার৷আজকের এই ভয়াবহ রূপ বঙ্কিমচন্দ্রকে দেখে যেতে হয়নি৷ 

 

 

 

আনন্দমঠে যেরকম সন‍্যাসী - ফকির বিদ্রোহ পরিপ্রেক্ষিতে হলেও শুধু সন‍্যাসীদের বীরত্ব দেখানো হয়েছে ৷ তেমনি আজকে বাংলার আন্দোলনে মমতার বীরত্ব দেখানো হচ্ছে ,ফলে মুসলমান সমাজকে আন্দোলন ও দল করলে নাওশাদ থেকে মফাকুরুল ইসলামকে জঙ্গি বলে জেল হতে হয়৷ সে সময় যেমন মজনু শাহ ও ভবানী পাঠকের আন্দোলন ছিল তেমনি আজকে উমার খালিদ ,শারজিল ইমাম ও লাদাকের ফুংশুক ওয়াংড়ু দের শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে৷ 

 

উনিশ শতকে বাংলায় উচ্চবর্ণের মধ্যে যে একপ্রকার জাগরণ এসেছিল ,চিন্তাচেতনায় বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রধাণতম একজন ব‍্যক্তি৷ তেমনি আজকে প্রকাশ‍্যে হিন্দু রাষ্ট্র তৈরির চিন্তা চেতনা দেখাযাচ্ছে তা বঙ্কিমচন্দ্রের ছায়া নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দেখতে পাচ্ছে সংখ‍্যাগরিষ্ঠের একটি বড় অংশ৷ যেরকম আগে বঙ্কিম সাহিত্য সমালোচনাকারীদের বঙ্কিমবিদ্বেষী এমনকি হিন্দুবিদ্বেষী বলা হত৷ তেমনি মোদি বিরোধিতা মানে হিন্দুবিদ্বেষী তথা দেশবিরোধী বলা হচ্ছে৷ 

 

উনিশ শতকে যে জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা হচ্ছিল তাতে মুসলমানদের যেমন কোনও অংশগ্রহণ ছিল না ৷শিক্ষিত ভারতীয়দের একটা অংশ ব্রিটিশদের প্রতি ছিল অনুগত৷

তেমনি আজকে যে নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলছে মুসলমানদের ভূমিকাহীন করা হচ্ছে৷ মুসলিমশূন্য নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে৷ আজকেও শিক্ষিত ভারতীয়দের একটা অংশ আর এস এস প্রতি অনুগত৷ 

 

উপন‍্যাসের শেষে সত‍্যনন্দের কাতরোক্তি -" আবার কি মুসলমান রাজা হইবে ?" এর উত্তরে চিকিৎসক বলেন -" ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতনধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই৷".... ইংরেজকে রাজা করিব ৷ .... যতদিন না তাহয় ,যত দিন না হিন্দু আবার জ্ঞানবান ,গুণবান আর বলবান হয় ,ততদিন ইংরেজরাজ‍্য অক্ষয় থাকিবে৷" সেই রকম আজকে বাংলায় মোদি সরকার চাই ,বাম থেকে রাম হয়ে যায় ফলে আজকের বাংলা ইংরেজ তথা আর এস এস অধীনে চলছে তবুও বাংলদেশ হয়ে যাবে এবং মুসলমান দখল করে নেবে বলে রামরাজ‍্য চাই চিকিৎসক থেকে শিক্ষক ,লেখক ,অধ‍্যাপকগণ৷ 

 

বঙ্কিমচন্দ্র তখন যে রকম নেশন গড়তে গিয়ে ব্রিটিশকে শত্রু না ভেবে মুসলমানদের স্থান নিতে হয়েছিল তেমন আজকে আচ্ছে দিন আনার জন্য মুসলমানকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে৷ বাংলায় অর্ধেক বেশি জনগোষ্ঠী মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু চেতনা দিয়েই গড়ে তোলা হচ্ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদী প্রতীক ৷ আজকে তেমন চলছে৷ আমাদের মনে রাখতে হবে যে - সাম্প্রদায়িকতা যেমন সরাসরি অন্য সম্প্রদায়কে শত্রু মনে করে ,আধিপত্য তেমন নয় ,তা বরং তার একরোখা সংস্কৃতির ভেতরে ভিন্ন সংস্কৃতির অবলুপ্তির সঙ্গে সেই জনগোষ্ঠীর আনুগত্য এবং অন্তর্ভুক্তি দাবী করে৷ তেমনি আজকে মোহনভাগবত দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক তৈরি করে আনুগত্য করতে চাই এবং ঘর ওয়াপসির মাধ্যমে হিন্দু ধর্মে অন্তর্ভুক্তি করতে চায়৷ সাম্প্রদায়িক সমস্যা বা দাঙ্গা ইত‍্যাদি যেমন সহজে চোখে ধরা পড়ে ,সাংস্কৃতিক আধিপত্য ব‍্যক্তিকে এমনভাবে ঘিরে থাকে যে তাকে চিহ্নিত করা সচেতন প্রয়াস ছাড়া সম্ভব নয় ৷ তাকে গড়ে তোলা হয় অতি ধীরে এবং সুচতুরভাবে ৷ সমাজে শিক্ষা - সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কর্তৃত্বের জায়গায় থাকা সম্প্রদায় এটা করতে গিয়ে এমন একটা পরিমন্ডল তৈরি করে যে ,ভিন্ন গোষ্ঠী বা সংস্কৃতির অনেক শিক্ষিত মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই নিজেদের শিক্ষিত ভদ্রলোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের ধারণাকে অস্বীকার করতে পারে না৷

 

 উনিশ শতকে সেই সময় মুসলমান সমাজ সমস্যার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল কারন ইংরেজ সব অধিকার কেড়ে নিয়ে ছিল ফলে শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে ছিল ৷ আজকে তেমনি নেতৃত্ব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মুসলমানদের ৷ নেতৃত্ব শূন্য করা হচ্ছে এদিকে বাংলায় শাসন ক্ষমতায় নেই বলে সিপিএম ও কংগ্রেস বেশিরভাগ মুসলমানকে কেন্ডিডেট করেছে ,ক্ষমতায় থাকলে এই চিত্র দেখা যেত না৷ আজকে যেরকম যেরকম সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ রাজনীতি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের কল‍্যাণ ও দেশাত্মবোধের প্রকাশ ও প্রসারের নামে হিন্দুত্ববাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত তা বঙ্কিম জামানায়ও ছিল৷ আজও অনেক কিছুর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের এই ব‍্যপক শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দীপনা জুগিয়ে চলেছে আনন্দমঠ উপন্যাসও ৷ 

 

বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসের অংশে লিখেছেন -" কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুঠিয়া লইতে লাগিল ৷ অনেক যবন নিহত হইল ,অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল ,জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল ,-- মুই হেঁদু৷ 

আজকে গণতান্ত্রিক দেশে দেখুন লাভ জিহাদের নাম ফাঁসানো হচ্ছে ৷ মসজিদ উপরে গেরুয়া ধ্বজ বাঁধা হচ্ছে ,রাস্তা ঘাটে হত্যা করা হচ্ছে , হিজাব নিয়ে মহিলাদের আক্রমণ হচ্ছে ,মুসলমান লোকজন টুপি ও মুসলমান লেবাস পরে বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে ,সেই মুই হেঁদু বলা শামিল বটেই৷ 

 

আজকে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতির জন্য বড় বাধা বঙ্কিমচন্দ্রের দেখানো হিন্দুরাষ্ট্র তত্ত্ব৷ বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন- " রাজনীতি সর্বপ্রথম সার্থকভাবে সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মের আশ্রয় গ্ৰহণ করলো বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ও অন‍্যান‍্য লেখায়৷ তাঁর আনন্দমঠই ভারতীয় মধ‍্যবিত্তের রাজনৈতিক চেতনার মধ্যে সর্বপ্রথম নিয়ে এলো ধর্মীয় বিভ্রান্তি৷ " তাই আজকে রাজনীতিতে ধর্মীয় উগ্ৰতা আনন্দমঠের মাধ্যমে প্রবাহমান৷ 

 

চিন্তাবিদ আহমদ শরীফ বলছেন --" যে আনন্দমঠ লিখে বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দুদের কাছে ঋষি হয়ে গেলেন ,সে আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র তখনই দেশের স্বাধীনতা চাননা৷তিনি হিন্দুদের বলেই দিলেন ,তোমরা এখনও স্বাধীনতার যোগ্য হওনি---৷ তেমনি মোদিকে হিন্দুদের বড় অংশ " হিন্দু হৃদয় সম্রাট "ও "বিশ্বগুরু' বানিয়ে ফেললেন৷ মোদি দা আর বঙ্কিম দা মিলেমিশে একাকার৷ 

 

যাঁরা মননে হিন্দুত্ব টিকিয়ে রাখতে চান এই ২০২৬ এ এসেও তাঁদের সাহিত্যবিচারও হিন্দুগন্ধী হওয়া স্বাভাবিক৷শিবনারায়ণ বলছেন - কিন্তু ভারতবর্ষ তো শুধু হিন্দুদের দেশ নয় ৷ বিশেষ করে বঙ্গদেশের অর্ধেক অধিবাসী মুসলমান৷ " বাঙালীর উৎপত্তি " বিষয়ে বিচারবিবেচনা করে বঙ্কিম সিদ্ধান্তে আসেন যে চার প্রকারের বাঙালি আছে: " এক আর্য ,দ্বিতীয় অনার্য হিন্দু ,তৃতীয় আর্যানার্য হিন্দু আর এক চতুর্থ জাতি বাঙালি মুসলমান৷প্রথম তিন প্রকারের হিন্দু বাঙালি হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতেও পারে ,কিন্তু বাঙালি মুসলমান কীভাবে তাদের সঙ্গে মিলিত হবে ?"  

এখনও বাঙালি হিসেবে বাঙালি মুসলমানকে মিলিত করা হয়নি ৷ ফলে তোরা বাঙালি নয় মুসলমান শুনতে পাওয়া যায় সব জায়গায়৷ তোদের নাম আরবি কি করে বাঙালি হল ? নিজেদের সংস্কৃত নাম থাকলেও বাঙালি৷ বাঙালি উৎসব না বলে মুসলমানদের উৎসব শিরোনাম হয় খবরের কাগজে৷ আরও একটু এগিয়ে বাংলাদেশী বলা হয় ৷ আরও একধাপ এগিয়ে বাংলাভাষার জন্য হত্যা করা হয় এবং পেলোডারে কাঁটাতার ওপারে ফেলে দেওয়া হয় ,কারন তাঁদের মতো করে আমরা বাঙালি নয় ৷

 

লেখক রণজিৎ অধিকারী লিখেছেন- গত দেড়শো বছরে বাংলায় অন্তত তিনটি ফেজে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা আগ্ৰাসী হয়ে উঠেছে : প্রথম- উনিশ শতকের শেষ কুড়ি- পঁচিশ বছর ,দ্বিতীয় - সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের পর দেশভাগ পর্যন্ত এবং সর্বশেষ ফেজটি এসেছে ২০১৪ পরবর্তীতে৷ সাহিত্যিকে ফিরে পড়ার পাঠ সময়ের নিরিখে বিচার করতে পারেন৷

 

বঙ্কিমচন্দ্র যেরকম আনন্দমঠ-এ ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে হিন্দু - মুসলমান সংগ্ৰাম হিসেবে নির্মাণ করেছেন তেমন আজকে মোদি ,আর এস এস শ্রমিকদের অধিকার ,চাকরি ,কর্মসংস্থান সব ভুলিয়ে হিন্দু - মুসলমান হিসেবে দাঁড় করাতে সফল হয়েছেন কারন হিন্দুদের ভয় দেখানো হয়েছে ভারত ইসলামী দেশ হয়ে যাবে ৷ জনসংখ্যা ও মুসলমানদের চারটে বিবাহ ইত্যাদি শব্দবিদ্বেষ প্রয়োগ করে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যাঁরা দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে বেহাল তবিয়তে আছেন৷ সব হিন্দুপুনরুথ্থান তথ্য চালানো হয়েছে৷

উনিশ শতকে নতুন করে যে হিন্দুত্বের নির্মাণ হচ্ছিল তার মধ্যে উচ্চবর্ণ তথা ব্রাম্মণ‍্যবাদী ধ‍্যান -ধারণাগুলিকেই কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল ,তেমনি আজকেও প্রযুক্তি যুগে চলছে ডিজিটাল হিন্দুত্ব৷প্রপাগান্ডা মূলক মুভি তার মধ্যে আছে৷

লেখক বলছেন - আমরা এখনও সাহিত্যের ব্রাম্মণ‍্যবাদী বিচার হিন্দু -জাগরণ ইত‍্যাদি নিয়ে মশগুল আছি৷ এতে সাহিত‍্য চর্চারও অগ্ৰগতি নেই ,বাঙালির মননেরও নয় ৷ এ সত্য যে বাঙালীর যদি চেতনা থাকত বাংলাভাগ হত না ৷ স্বদেশপ্রেমের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের মিশেল ঘটত না৷কারন ,বাঙালি কখনও ই সমাজ অর্থে সমগ্র বাঙালিকে বোঝেনি ; হিন্দু - মুসলমানে ,উচ্চবর্ণে - নির্মবর্ণে ভাগ হয়ে থেকেছে সমাজ৷বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের আগে পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই হিন্দু - মুসলমান মিলিত সমাজের ছবি উঠে এসেছে৷ বঙ্কিমচন্দ্রে না ,রবীন্দ্রনাথে না ,শরৎচন্দ্র - বিভূতিভূষণেও না ; সাহিত‍্যে সমগ্র সমাজের চিত্র উঠে এসেছে অনেক পরে৷ তাই অবচেতন বা সচেতনভাবে এখনও বাঙালি মানে খন্ডিত একটা সম্প্রদায়৷

 

সম্প্রতি ভারতরাষ্ট্র গঠনের নতুন হিন্দুত্ববাদী তোড়জোড়৷ তা বাঙালি হিন্দুদের আধিপত্য - সমাজে শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতিতে সর্বোপরি সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে৷ এখান থেকে বেরিয়ে আসা কাজ কঠিন কারন রাষ্ট্র হিন্দুত্ববাদী মনন গঠনে যত্মশীল আর সেই পরিমন্ডলে আশিক্ষিত- আধাশিক্ষিত - পন্ডিত সবাই একসঙ্গে উল্লাসিত ৷

 

কারন -সেই আনন্দমঠ- এ বলা হয়েছে " মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধা মাধবের মন্দির গড়ব" — এই ধরণের উক্তিটি মূলত ভারতের রাজনীতিতে বলতে গেলে আমার আলোচনা " আনন্দভোট " - এ বাবরি মসজিদ ধ্বংস এ রাম মন্দির নির্মাণের মধ্যে দিয়ে নির্বাচন চলছে

 

 

ফিরে দেখা:-

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এর প্রধান চরিত্রগুলো হলো: মহেন্দ্র (জমিদার), কল্যাণী (মহেন্দ্রের স্ত্রী), সত্যানন্দ (সন্তান দলের নেতা), ভবানন্দ, জীবানন্দ, শান্তি (যিনি পরবর্তীকালে সন্ন্যাসিনী হন) এবং সুকুমারী (মহেন্দ্রের কন্যা) 

 

তেমনি ভারতের নির্বাচন " আনন্দভোট' এ প্রধান চরিত্র গুলো - মোদি ,মমতা ,আমিত শাহ ,শুভেন্দু ,বিশ্বন্ত শর্মা ,যোগী ,দিলীপ ,মোহনভাগবত দিয়ে পড়তে পারেন৷ 

 

 

তথ্য : 

1. পাঠকের কান্ডজ্ঞান ,আনন্দমঠ -এর পুনপাঠ ও বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ে পুরনো বিতর্ক নিয়ে নতুন তর্ক - রণজিৎ অধিকারী ( প্রবন্ধ ) ,চার নম্বর প্লাটফর্ম ,এর অনুকরণে লিখলাম৷

ওয়াহেদ মির্জা
ওয়াহেদ মির্জা

কবি ও প্রাবন্ধিক